ক্ষমতা না জনতা : ৪০০ শিল্প কারখানা বন্ধ

ড. মো. আনোয়ার হোসেন, লেখক, প্রাবন্ধিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল

প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি জাতির মেরুদণ্ড যখন তার উৎপাদনশীল কারখানায় নয়, বরং শুধু স্লোগানের পেছনে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন সেই জাতির বিবর্তনকে পশ্চাৎমুখী বিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করা যৌক্তিক। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পরবর্তী সময়ে প্রায় ৪০০টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং প্রায় পাঁচ লাখ শ্রমিকের বেকারত্বের এই চিত্রটি শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে সেই মৌলিক প্রশ্ন- একটি রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি কি নিছক প্রশাসন নাকি সাধারণ জনতা? যখন শত শত চিমনি থেকে ধোঁয়া বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং কয়েক লাখ পরিবারের উনুনে আগুন জ্বলা থমকে দাঁড়ায়, তখন গালভরা বুলিগুলো শুধু উপহাসেরই প্রতিধ্বনি শোনায়। বৈজ্ঞানিক ধারায় কোনো ক্রিয়া ছাড়া প্রতিক্রিয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি শ্রমিকের শ্রম ছাড়া অর্থনীতির চাকা সচল রাখা জাদুমন্ত্র দিয়ে সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রের কাঠামোতে যখন গণমানুষের চেয়ে মোহাচ্ছন্নতা বড় হয়ে ওঠে, তখন নৈতিকতা একটি বিমূর্ত অলংকারে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পের এই বর্তমান বিপর্যয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি নীতিনির্ধারণী স্থবিরতার এক চরম নিদর্শন। বিটিএমএ-র ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা এটিই প্রমাণ করে যে, শিল্পের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় রাষ্ট্র তার প্রাথমিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। এই যে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হচ্ছে, তাদের যাতনা আর সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা কি কোনো সমীকরণে স্থান পায়?

সংগঠনগুলো যারা একসময় রাজপথ কাঁপিয়ে জনতার পক্ষে আওয়াজ তুলত, তাদের বর্তমান নির্লিপ্ততা ভাবিয়ে তুলছে। জনতা যখন ক্ষুধার জ্বালায় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তৎপরতা শুধু গুটিকয়েক উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে তাকে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম বলা চলে না। এটি মূলত এক ধরনের সামষ্টিক ব্যর্থতা। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি বড় গণঅভ্যুত্থান বা পরিবর্তনের পেছনে ছিল অর্থনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে গণমানুষের ক্ষোভ। যখন টেক্সটাইল মিলের স্পিনিং হুইল থেমে যায়, তখন আসলে একটি জাতির সমৃদ্ধির চাকা থেমে যায়। উৎপাদন যন্ত্রের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ যার হাতেই থাকুক, শ্রমিকের অধিকার ও কাজের নিশ্চয়তা রাষ্ট্রের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়ার কথা। অথচ আজ আমরা দেখছি এক অদ্ভুত স্থবিরতা, যেখানে জনতার রুটি-রুজিকে জলাঞ্জলি দেওয়া হচ্ছে। যদি জনতা শুধু স্লোগান দেওয়ার জন্যই ব্যবহৃত হয় আর কর্মসংস্থানের বেলায় তারা অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুধু যৌক্তিক নয়, বরং বাধ্যতামূলক। এটি কোনো রম্য নয় যে, কয়েক লাখ মানুষ না খেয়ে থাকবে আর আমরা গান গাইব; এটি আসলে এক করুণ উপাখ্যানের প্রারম্ভিকা।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, একটি দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা সরাসরি তার শিল্পায়নের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সরকারের আমলে এই যে ৪০০ কারখানা বন্ধ হলো, এর ফলে শুধু পাঁচ লাখ মানুষ নয়, বরং পরোক্ষভাবে দুই কোটি মানুষ সংকটে পড়েছে- এটি কি কোনো রাষ্ট্রের কাম্য হতে পারে? আইনি কাঠামোতে শ্রমিকের বেঁচে থাকার অধিকার ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র তার উল্টো। সংগঠনগুলো যারা নিজেদের জনতার পাহারাদার দাবি করে, তাদের এই বিষয়ে নীরবতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, জনতার পাল্লা তাদের কাছে ভারি নয়। তারা হয়তো ভুলে গেছে যে, ইতিহাসের কাঠগড়ায় শুধু শাসক নয়, নীরব দর্শকদেরও বিচার হয়। অধিকার শুধু কাগজে কলমে থাকলে তাকে অধিকার বলা যায় না। যখন রাষ্ট্র কলকারখানা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্র বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। বেকারত্ব যখন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন অপরাধ প্রবণতা এবং সামাজিক অস্থিরতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হওয়ার ফলে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং এক ভয়াবহ সামাজিক বিস্ফোরণের পূর্বাভাস। বিটিএমএ-র মতো বড় একটি সংগঠন যখন হতাশায় ধর্মঘটের ডাক দেয়, তখন বুঝতে হবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। অথচ এই সংকট উত্তরণে বৈজ্ঞানিক কোনো পরিকল্পনা বা কৌশলগত কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। এই উদাসীনতা আসলে একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়া হওয়ারই নামান্তর। তারা চিৎকার করে বলছে ‘জনতাণ্ডজনতা’, কিন্তু তাদের পদক্ষেপে ধ্বনিত হচ্ছে না।

একটি রপ্তানিমুখী শিল্পের ধস নামা মানে বিশ্ববাজারে দেশের ভাবমূর্তি আর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে যাওয়া। এই ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়, এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদার অপমৃত্যু। কেন আজ ছাত্ররা কারখানার ফটকে দাঁড়িয়ে মালিক-শ্রমিকের পাশে দাঁড়াচ্ছে না? কেন তাদের স্লোগানগুলো শুধু প্রশাসনিক সংস্কারের ঘেরাটোপে আটকে আছে? মানুষের পেটে ভাত না থাকলে সেই সংস্কারের কোনো মূল্য নেই- এই ধ্রুব সত্যটি বুঝতে কেন এত বিলম্ব হচ্ছে? কি তাদের জিভকে আড়ষ্ট করে দিয়েছে অথবা তারা এক কাল্পনিক স্বর্গরাজ্য গড়ার স্বপ্নে বিভোর যেখানে মানুষের প্রয়োজন গৌণ। এই যে বিটিএমএ-র ঘোষণা, এটি কোনো সাধারণ ধর্মঘট নয়, এটি রাষ্ট্রের নপুংসকতার বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য চপেটাঘাত। যদি এখনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই ক্ষোভ শুধু কলকারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি ছড়িয়ে পড়বে সমাজের প্রতিটি স্তরে।

আইনগত দিক থেকে দেখলে, শ্রমিকদের এই গণ-বেকারত্ব সরাসরি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের জান-মালের পাশাপাশি কর্মের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকদের সামাজিক চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হয়। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী মানুষেরা আজ কোথায়? কেন তারা এই পুঁজিপতি আর শ্রমিক উভয়ের এই যৌথ সংকটে নীরব? রাজনৈতিক এই পাশাখেলায় জনতা শুধু দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদলের এই সন্ধিক্ষণে যারা সবচেয়ে বেশি ত্যাগের দাবিদার ছিল, আজ তারাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। এটি একটি গভীর ট্র?্যাজেডি যেখানে চালক আছে কিন্তু চাকা নেই, শাসক আছে কিন্তু জনগণের অন্ন নেই। এই বিদ্রোহের আগুন যখন জ্বলে উঠবে, তখন ক্ষমতা বা জনতা- এই বিতর্কের অবকাশ থাকবে না, থাকবে শুধু এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে হাহাকার করা একটি জাতি। একটি জাতির মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা তখনই নিশ্চিত হয় যখন তার উৎপাদনশীল কর্মশক্তি কর্মক্ষম থাকে। অথচ আমাদের দেশে এখন এক ধরনের রাজনৈতিক মনোবিকার চলছে যেখানে সমস্যার সমাধান খোঁজার চেয়ে সমস্যা এড়িয়ে যাওয়াকেই চতুরতা মনে করা হচ্ছে। টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলগুলো যখন একে একে বন্ধ হচ্ছে, তখন দেশের নেতৃত্ব কি নিয়ে ব্যস্ত? এর চেয়ে বড় রম্য আর কী হতে পারে যে, মানুষ না খেয়ে মরছে আর আমরা টিভিতে গণতন্ত্রের সবক দিচ্ছি? স্লোগান দিয়ে পেট ভরে না, ভাতের জন্য কারখানার চাকা ঘুরতে হয়। আর সেই চাকা যখন থেমে যায়, তখন জনতার জীবন সংসার ধূলিসাৎ হতে বাধ্য।

কলকারখানা বন্ধ হওয়া নিয়ে নির্লিপ্ততা এটিই প্রমাণ করে যে, জনতার দুঃখ-দুর্দশা কারও এজেন্ডায় নেই। রাজনৈতিক মেরুকরণের এই খেলায় শ্রমিকের ঘাম আর দীর্ঘশ্বাস শুধু পরিসংখ্যান হয়ে ফাইলবন্দি হয়ে আছে। বিটিএমএ-র মতো সংস্থাগুলো যখন রাজপথে নামার হুমকি দেয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। যদি ফেব্রুয়ারি থেকে সত্যিই সব টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে যায়, তবে এর দায়ভার কে নেবে?

মনে রাখতে হবে, শ্রমিকরা অধিকারের দাবিতে যখন রাজপথে নামবে, তখন এই ফাঁপা স্লোগানগুলো তাদের আর শান্ত করতে পারবে না। কারণ, ক্ষুধার কোনো রাজনীতি নেই, ক্ষুধার একমাত্র ভাষা হলো রুটি।

একটি দেশ তখনই সফল হয় যখন তার অর্থনীতি আর রাজনীতি হাত ধরাধরি করে চলে। বর্তমানের এই শিল্প বিপর্যয় এটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের দেশের কাঠামোটি কতটা নড়বড়ে। বিটিএমএ-র এই চূড়ান্ত আল্টিমেটাম শুধু সরকারের জন্য নয়, বরং গোটা জাতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। ক্ষমতা আর জনতার এই লড়াইয়ে যদি জনতা হেরে যায়, তবে রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের পরাজয় নিশ্চিত। মনে রাখতে হবে, জনতার হাহাকার একসময় সেই অন্ধত্বের দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দেয়।

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান, অবিলম্বে দেশের শিল্প কলকারখানাগুলো রক্ষায় কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। ব্যাংক ঋণ পুনর্গঠন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, ফেব্রুয়ারির থেকে যে শ্মশান নীরবতা শুরু হবে, তার দায়ভার নিতে হবে এই প্রজন্ম ও ক্ষমতার কর্ণধারদের। জাতির এই কঠিন সময়ে ছাত্র সংগঠনগুলোকে শুধু দলীয় বৃত্তে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ শ্রমিকের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিল্প বাঁচলে শ্রমিক বাঁচবে, আর শ্রমিক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জনতা চিরস্থায়ী- এই চিরন্তন সত্যটি অনুধাবন করাই হবে এই সংকটের একমাত্র উত্তরণ পথ।

শিল্প কলকারখানার চিমনিগুলো যদি শীতল হয়ে যায়, তবে জাতির ভবিষ্যতও শীতল হয়ে পড়বে। বিদ্রোহ শুধু স্লোগানে নয়, বিদ্রোহ হওয়া উচিত অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে। এই বিশ্লেষণ শুধু একটি নিবন্ধ নয়, বরং এটি একটি জাতির আর্তনাদ। আশা করি, নীতিনির্ধারকদের কানে এই আর্তনাদ পৌঁছাবে এবং তারা ‘ক্ষমতা না জনতা’- এই প্রশ্নের উত্তরে শুধু মুখে নয়, কাজেও ‘জনতা’ প্রমাণ করতে সচেষ্ট হবেন। অন্যথায়, ইতিহাস তার আপন গতিতে এই অবহেলার বিচার করবে এবং অবশ্যম্ভাবী।