মেয়েদের স্বপ্নের ভারসাম্য কোথায়
আরশী আক্তার সানী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে বিয়ে এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যা জন্মের সময় থেকেই মেয়েদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ছোট থেকেই মেয়েরা বারবার শোনা শুরু করে এখন তো বিয়ে করার বয়স, তোমার বয়স বাড়ছে, আর দেরি করো না, তোমার জন্য ভালো বিয়ে পেতে হলে এখনই সময়। এই বাক্যগুলো যেন সমাজের অদৃশ্য টাইমার, যা মেয়েদের মনে চাপ তৈরি করে। বিয়ে শুধুমাত্র দুইজন মানুষের সম্পর্ক নয়; এটি সমাজের মান-ইজ্জত, পারিবারিক সম্মান, আত্মীয়-স্বজনের প্রত্যাশা এবং সামাজিক চোখের নজরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই চাপের ভেতরে মেয়েদের স্বপ্ন, শিক্ষা, স্বাধীনতা ও ক্যারিয়ার কোথায়? কি তারা নিজের মতো করে জীবন গড়তে পারে, নাকি সমাজের তৈরি শৃঙ্খলেই বাধ্য হয়ে চলতে হবে?
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মেয়েদের নূন্যতম বিয়ের বয়স ১৮। কিন্তু সমাজের চোখে নূন্যতম বয়স মানেই সঠিক সময়। ১৮-২০ বছর বয়সকে এমনভাবে দেখা হয় যেন এটি মেয়ের জীবনের একমাত্র সম্ভাব্য সময়। ২২-২৪ বছর হলে পরিবার ও আত্মীয়রা উদ্বিগ্ন হয়, আর ২৫-২৬ বছর পেরুলেই চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হয়। শহরে মেয়েরা এখন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে, স্কিল ডেভেলপ করছে, ক্যারিয়ার গড়ে তুলছে। কিন্তু সমাজের দৃষ্টিতে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যেন বিয়ে বিলম্বের অপবাদ। সামাজিক চাপ ও মানসিক টান তার স্বপ্নকে হালকা বা তুচ্ছ মনে করিয়ে দেয়।
মেয়ের বয়স বাড়লেই আত্মীয়-স্বজন মন্তব্য করতে শুরু করে এখনও বিয়ে হয়নি কেন? দেখো, ওর মেয়ে বিয়ে হয়ে গেল, তোমার বিয়ের কী খবর? এই প্রশ্নগুলো নিছক কৌতূহল নয়, বরং চাপ ও দুশ্চিন্তার একটি উপায়। পরিবার ও আত্মীয়দের এই চাপ মেয়েদের জীবনের স্বাধীনতা হরণ করে। তারা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে আমার স্বপ্ন বা পছন্দ কম গুরুত্বপূর্ণ, সমাজের মান্যতা বড়। অনেক সময় এই চাপ মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে, আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মেয়েদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনাকে ব্যাহত করে।
সমাজের অদৃশ্য চোখ মেয়েদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে বিচার করে। বিশেষ করে বিয়ে ও ক্যারিয়ার বিষয়ে। পরিবার মেয়ের বয়স, স্বপ্ন এবং প্রস্তুতি বোঝার আগে চিন্তা করে লোকজন কি বলবে? এই এক ধরনের সামাজিক নজরদারি মেয়েদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। যে মেয়েরা স্বাধীনতা চায় বা তাদের স্বপ্নপূরণ করতে চায়, তারা প্রায়ই ভয়ে ঘেরা হয়ে যায়। কারণ সমাজে প্রতিটি বিলম্বিত বিয়ে ভুল হিসেবে ধরা হয়, যদিও বাস্তবিকভাবে তা ঠিক নয়। মেয়েরা যখন উচ্চশিক্ষা, বিদেশে পড়াশোনা, ক্যারিয়ার বা ব্যবসা শুরু করতে চায়, পরিবার প্রায়ই মনে করে আচ্ছা, পরে হবে, আগে বিয়ে হোক।
সমাজের এই মনোভাব মেয়েদের স্বপ্নকে প্রতিযোগিতামূলক বা অতিরিক্ত হিসেবে দেখায়। এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, মানসিক ও সামাজিক বৈষম্যও তৈরি করে। মেয়েদের সম্ভাবনা ও স্বপ্নকে ছোট করে দেখানো হয়, যার ফলে আত্মবিশ্বাসে হ্রাস হয় এবং তারা নিজেদের ক্ষমতার ওপর সন্দেহ করতে শুরু করে।
যেখানে ছেলেরা ৩০ বছর বয়সেও ক্যারিয়ার ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়, মেয়েরা সেই বয়সে বিয়ের চাপের মুখোমুখি হয়। পরিবার ও সমাজ ভাবতে থাকে বয়স তো হচ্ছে। এই ধরনের পার্থক্যই বৈষম্যকে বাড়িয়ে তোলে। অসংখ্য মেয়ে উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার ও স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন রাখে, কিন্তু সেই পথে societal pressure তাদের পেছনে টেনে ধরে। বিয়ের চাপের কারণে মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য প্রভাবিত হয়। তারা আত্মবিশ্বাস হারায়, নিজের স্বপ্নকে ছোট করে দেখে, হতাশা ও উদ্বেগে ভুগতে শুরু করে। সামাজিক চাপ মেয়েদের জন্য শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবে ও ক্ষতিকর। অনেক মেয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে আমার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ নয়, বিয়ে ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ অনেক সময় তাদের জীবনের গতিকে বিপরীতভাবে প্রভাবিত করে।
পরিবার ও সমাজের ধারণা মেয়েদের বিয়ে ও বয়সকে পরিবারের সম্মানের সঙ্গে যুক্ত করে। যেন মেয়ের বিয়ে না হওয়া মানেই পরিবারের মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু সত্যিকারের সম্মান হলো নিরাপত্তা, বোঝাপড়া, সহানুভূতি বিয়ের বয়স নয়। একটি পরিবারের দায়িত্ব হওয়া উচিত মেয়ের স্বপ্ন ও স্বাধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। তখন মেয়েরা শুধু পরিবারকেই নয়, সমাজকেও শক্তিশালী করে।
স্বাবলম্বী মেয়েরা সমাজকে বদলায় একজন নারী যখন স্বাবলম্বী হয় শিক্ষিত হয়, চাকরি করে, নিজের ব্যবসা গড়ে তাহলে সে কেবল নিজের জীবনই উন্নত করে না। সে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও প্রভাবিত করে। স্বাবলম্বী নারী বিয়ে করলে সম্পর্কগুলো আরও সমান ও স্বাস্থ্যকর হয়। সমাজ প্রায়ই বিয়েকে নারীর জীবনের প্রধান লক্ষ্য মনে করে। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষা, কর্মজীবন, স্বাধীনতা, ব্যক্তিত্ব, সক্ষমতা সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে হওয়া উচিত জীবনের অংশ হিসেবে, বাধ্যতামূলক নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার? বিয়ের সঠিক সময় ব্যক্তি নিজেই নির্ধারণ করবে। কোনো বয়সের সীমা নেই। ২২-৩০-৩৫- প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন। সমাজ ও পরিবার যখন এই অধিকার হরণ করে, তখনই সমস্যার সূত্রপাত হয়। ভারসাম্য কোথায়? ভারসাম্য আসে যখন পরিবার মেয়ের মতামতকে গুরুত্ব দেয় মেয়েকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে বিয়ে ও স্বপ্নের মধ্যে সমন্বয় করা হয় এটাই সুস্থ, মানবিক এবং সমানাধিকার ভিত্তিক সমাজের চাবিকাঠি।
শহরের আধুনিক পরিবারগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মেয়েরা এখন বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে, ক্যারিয়ার গড়ছে, পরে বিয়ে করছে। গ্রামাঞ্চল ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত এলাকায় ধীরে হলেও পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
বিয়ে জীবনের অংশ, কিন্তু পুরো জীবন নয়। একজন নারী যখন নিজের জীবন, স্বপ্ন ও সিদ্ধান্ত নিজের হাতে রাখে, তখন সে শক্তিশালী, পরিপক্ব ও স্বাধীন হয়। সমাজের উচিত মেয়েদের স্বপ্নকে সম্মান করা, তাদের বিয়ে ও ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত নিতে স্বাধীনতা দেওয়া। বিয়ের সময় নির্ধারণ করবে মেয়েটি নিজেই এটাই হওয়া উচিত সমাজের নতুন মানদণ্ড।
