ঢাকা কি মানুষের জন্য, না কংক্রিটের জন্য
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা- এই শহর একসময় পরিচিত ছিল নদী, খাল, সবুজ আর প্রাণচাঞ্চল্যের জন্য। আজ সেই ঢাকাই পরিচিত কংক্রিটের জঙ্গল, যানজট, শব্দদূষণ আর শ্বাসরুদ্ধকর জীবনের প্রতীক হিসেবে। প্রশ্ন উঠছে- ঢাকা কি এখনও মানুষের বসবাসের জন্য, নাকি এটি কেবল কংক্রিট আর মুনাফার শহরে পরিণত হয়েছে?
প্রতিদিন সকাল শুরু হয় যানজট দিয়ে, শেষ হয় ক্লান্তি আর হতাশা নিয়ে। কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফুটপাত দখল হয়ে যায় দোকান আর অবৈধ স্থাপনায়, রাস্তা সংকুচিত হয় অপরিকল্পিত নির্মাণে। শহরের সাধারণ মানুষ যেন প্রতিদিন এক অদৃশ্য লড়াইয়ে নামছে- সময়ের সঙ্গে, দূষণের সঙ্গে, আর বেঁচে থাকার নূন্যতম স্বস্তির সঙ্গে। ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকট পরিকল্পনার অভাব। শহর বাড়ছে, কিন্তু মানুষের চাহিদা ও পরিবেশের ভারসাম্য বিবেচনায় নিয়ে নয়। আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠছে বাণিজ্যিক ভবন, জলাধার ভরাট করে বানানো হচ্ছে বহুতল। শহরের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত খোলা মাঠ, পার্ক ও জলাশয় একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। কংক্রিটের দেয়াল যত উঁচু হচ্ছে, মানুষের নিঃশ্বাস ততই ভারী হয়ে উঠছে।
নদী ও খাল ছিল ঢাকার প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা। আজ সেই খালগুলো দখল ও দূষণে প্রায় অস্তিত্বহীন। বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা ঢাকার নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই শহরের বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়। অথচ এই সংকট নতুন নয়, সমাধানও অজানা নয়। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, উন্নয়নের নামে আমরা কেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি?
ঢাকার বাসযোগ্যতা শুধু অবকাঠামোগত সংকটে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সামাজিক ও মানবিক সংকটও। শিশুদের খেলার মাঠ নেই, বৃদ্ধদের হাঁটার জায়গা নেই, তরুণদের মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ নেই। শহরের মানুষ ধীরে ধীরে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়ছে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কও যান্ত্রিক হয়ে উঠছে—কারণ এই শহরে কারও কাছে কারও জন্য সময় নেই।
শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ ঢাকার আরেকটি নীরব ঘাতক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদ- অনুযায়ী ঢাকার বায়ুর মান প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে থাকে। ধুলো, ধোঁয়া আর নির্মাণকাজের বর্জ্যে ঢাকার বাতাস ভারী। এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রে, বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যে, আর কর্মক্ষম মানুষের জীবনযাত্রায়। অথচ এই দূষণ যেন আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়। শহরের এই কংক্রিটায়নের পেছনে রয়েছে এক ধরনের উন্নয়ন দর্শন, যেখানে মুনাফা মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, বহুতল ভবন—সবই উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কিন্তু উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনমান উন্নত না করে, তাহলে সেই উন্নয়নের অর্থ কী? উন্নয়ন কি শুধু গাড়ির জন্য, নাকি মানুষের জন্য? ঢাকার আরেকটি বড় সমস্যা হলো সামাজিক বৈষম্য। একদিকে গেটেড কমিউনিটি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জীবন; অন্যদিকে বস্তিবাসী মানুষের অনিশ্চিত জীবন, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতা। একই শহরে বসবাস করেও মানুষের জীবনের বাস্তবতা যেন দুই ভিন্ন জগতের। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি মানবিক সংকটও বটে।
নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ঢাকা আরও কঠিন। নিরাপদ গণপরিবহন, সহজ চলাচল, নিরাপদ রাস্তা এসব এখনও ঢাকায় নিশ্চিত নয়। শহর পরিকল্পনায় এই জনগোষ্ঠীর চাহিদা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। ফলে শহরটি ধীরে ধীরে সবার জন্য নয়, কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য উপযোগী হয়ে উঠছে। তবে এই অন্ধকারের মধ্যে সম্ভাবনা আছে। বিশ্বের অনেক শহরই একসময় ঢাকার মতো সংকটে ছিল, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছায় তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সবুজ নগরায়ণ, গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ, পথচারী বান্ধব শহর এসব কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টেকসই শহরের মৌলিক শর্ত। ঢাকাকে মানুষের শহর বানাতে হলে প্রথমেই দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শহরকে শুধু জমি ও ভবনের সমষ্টি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি জীবন্ত সত্তা। পরিকল্পনায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, পরিবেশকে উন্নয়নের শত্রু নয়, সহযোগী হিসেবে দেখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি। কে দখল করছে খাল, কে অনুমতি ছাড়া ভবন তুলছে, কে পরিবেশ ধ্বংস করছে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ও দায় নির্ধারণ না করলে ঢাকার ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হয়ে উঠবে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই, এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সাধারণ, আমরা কেমন ঢাকা চাই? এমন একটি শহর, যেখানে মানুষ শুধু টিকে থাকে, নাকি এমন একটি শহর, যেখানে মানুষ বাঁচে? যদি উত্তর হয় দ্বিতীয়টি, তাহলে কংক্রিটের চেয়ে মানুষকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঢাকা যদি মানুষের জন্য হয়, তবে তাকে শ্বাস নিতে দিতে হবে, হাঁটতে দিতে হবে, হাসতে দিতে হবে। নইলে এই শহর কেবল ইট-সিমেন্টের স্তূপ হয়ে থাকবে- মানুষ থাকবে, কিন্তু জীবন থাকবে না।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
