বর্তমান প্রজন্মের মূল্যবোধের অবক্ষয়
ফাহিমা আক্তার
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা যদি হজরত আলী (রা.)-এর নামে প্রচলিত ও বহুল উদ্ধৃত উক্তিটি- ‘পিতামাতার পর শিক্ষকের স্থান’- লক্ষ্য করি, তাহলে সহজেই অনুধাবন করা যায় শিক্ষকের সম্মান কতোটা মহান ও উচ্চ মর্যাদার। পিতামাতা আমাদের জন্ম দেন ও লালন-পালন করেন, আর শিক্ষক আমাদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও জীবনের সঠিক পথের দিশা দেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এই সম্মানবোধের ঘাটতি আজ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বর্তমানে পরীক্ষার সময় নকল করা, নকল পরীক্ষার্থী সেজে পরীক্ষা দেওয়া, ঘুষ গ্রহণ, জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার, যৌন হয়রানি, গুরুজনদের প্রতি অবজ্ঞা, অসহায়দের প্রতি উদাসীনতা, মাদকাসক্ততা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং আইনের অবমাননার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড অবলীলায় ঘটে যাচ্ছে। মূলত পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার দুর্বলতা, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা, বেকারত্ব, পারিবারিক অনুশাসনের অভাব, প্রযুক্তির অপব্যবহার, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, সঙ্গদোষ ও সুশাসনের অভাবসহ অসংখ্য কারণ এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
সম্প্রতি একজন সুযোগ্য শিক্ষক মোহাম্মদ আলমগীর সোহাগ স্যারের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে জানা গেছে, যিনি দীর্ঘ ২২ বছর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত এবং বর্তমানে সাউথ পয়েন্ট স্কুলে শিক্ষকতা করছেন এবং তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে ইউনিভার্স কোচিং সেন্টার, বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষকদের প্রতি সম্মানবোধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী আজ শিক্ষকের মর্যাদা ও অবদানকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করছে না। শিক্ষকদের কথার ব্যঙ্গ করা, তাদের নামে মিথ্যা রটানো, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সম্মানহানি করা কিংবা অযৌক্তিক দাবি-দাওয়া তোলার মতো ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। যা শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বার্তা বহন করে।
এছাড়াও ঐন্দ্রিলা নামের একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে জানা গেছে, তার বাবা-মা দুজনই চাকরিজীবী হওয়ায় সে দিনের অধিকাংশ সময় কম্পিউটারে গেম খেলে ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কাটায়। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস তাকে অসামাজিক করে তুলছে। সে সারাক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল জগতের মধ্যে ডুবে থাকে, যার ফলে বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক থেকে সে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। এই চিত্র শুধু ঐন্দ্রিলার নয়; শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্রই এমন অসংখ্য শিশুর বাস্তবতা আজ আমাদের চোখের সামনে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বাবা-মা দুজনই কর্মজীবী হওয়ায় সন্তানটি তাদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সময় ও সান্নিধ্য পাচ্ছে না। এই সময়ের অভাবই তাকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলছে এবং ধীরে ধীরে একটি নিঃসঙ্গ ও অসামাজিক জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নতুনত্বের প্রতি তরুণ সমাজের আসক্তি, পরিবারের উদাসিনতা, অপর্যাপ্ত শাসন, সামাজিক অসচেতনতা, ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে জীবনযাপন, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ইত্যাদি কারণে সামজিক অবক্ষয়ের মাত্রা চরমে পৌঁছেছে- যা সমাজের অগ্রগতিতে হুমকিস্বরূপ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে মূল্যবোধ গঠনে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। যেহেতু একটি শিশুর সর্বপ্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক বাবা-মা সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারছেন না। বাবা-মা দুজনই ব্যস্ত থাকায় অধিকাংশ সময় শিশুরা মোবাইল ফোন ও অন্যান্য প্রযুক্তির সঙ্গে কাটাচ্ছে। এর ফলে তারা আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে, যা তাদের আচরণ ও চরিত্র গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
যেহেতু একজন শিশুর মূল্যবোধ বিকাশে একা পরিবারের দায় নেই, তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কাজ করতে হবে।
পরিবার থেকে সর্বপ্রথম নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও সম্মানবোধের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারে শেখা এই মূল্যবোধই পরবর্তীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিকশিত হবে, সমাজে চর্চিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে আরও সুসংহত রূপ পাবে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে একটি মূল্যবোধসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে।
ফাহিমা আক্তার
শিক্ষার্থী, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ
