কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে আতঙ্কিত জনজীবন
তাহমিদুল হাসান আকন্দ
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমানে আমাদের সমাজে কিশোর গ্যাং একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিশোর গ্যাং হলো ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সের ছেলে-মেয়ে যারা একত্রে সংঘটিত হয়ে সমাজে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে থাকে। কিশোর গ্যাং দ্বারা সংঘটিত অপরাধমূলক কার্যক্রমগুলোর মধ্যে অন্যতম- সন্ত্রাসী, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং এবং মাদক ব্যবসা ।
কিশোর গ্যাং দ্বারা সংঘটিত কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইভটিজিং। প্রায় সময় দেখা যাচ্ছে রাস্তার অলিতে গলিতে দলবেঁধে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করছে, কেউবা প্রেম নিবেদন করছে। প্রেম নিবেদনে সাড়া না পেয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করছে এমনকি এসিড নিক্ষেপের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে। ফলস্বরূপ কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচারে স্বাধীনভাবে রাস্তায় চলাচল করতে পারছে না মেয়েরা।
কিশোর গ্যাংয়ের আরও একটি অপরাধমূলক কাজ হলো ডাকাতি করা। রাতের আঁধারে নির্জন রাস্তায় যখন কোনো পথচারী একা একা হেটে যায় তখনেই দলবেঁধে পথচারীকে ঘিরে ধরে এবং দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার সঙ্গে থাকা যাবতীয় জিনিসপত্র নিয়ে যায়। যখন কোনো পথচারী তার জিনিসপত্র দিতে অস্বীকৃতি জানায় তখনই সেই পথচারীকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে যার ফলে পথচারীর হয় মৃত্যু অথবা ভাগ্যক্রমে কোনো কোনো পথচারী আঘাত পাওয়ার পরও বেঁচে যায়।
কিশোর গ্যাংয়ের জনপ্রিয় আরও একটি কাজ হলো চাদাঁবাজি এবং হুমকি-ধমকি দেওয়া।
চাঁদাবাজি নিত্যকার ঘটনা। পত্রিকার পাতা বা টেলিভিশনের নিয়মিত শিরোনাম হচ্ছে চাঁদাবাজির খবর। এই চাঁদাবাজির সিংহভাগ সংঘটিত হয় কিশোর গ্যাং দ্বারা। ফুটপাতের দোকান থেকে শুরু করে সুপার শপ গুলোতেও চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। এছাড়াও বাসস্ট্যান্ডে, টেম্পুস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত সংঘটিত হচ্ছে চাঁদাবাজি। চাঁদা দিতে কেউ অসম্মতি জানালে তখন এই শুরু হয় হুমকি-ধমকি। কিশোর গ্যাং এর চাঁদাবাজি এবং হুমকি-ধমকির ফলে আতঙ্কিত জীবন অতিবাহিত করছে ক্ষুদ্র, মাঝারি এমন কী বৃহৎ ব্যবসায়ীরাও।
কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ আতঙ্ক ছড়িয়ে পরছে সমাজে। ফলে সমাজের স্বাভাবিক কাজকর্ম হচ্ছে বিঘ্নিত। আতঙ্কিত জীবন অতিবাহিত করছে সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং এর প্রিয় কার্যক্রম হলো মাদক ব্যবসা। মাদকের যোগান শহরের অলি-গলিসহ গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পরছে। মাদকের সিংহভাগ যোগান কিশোর গ্যাং দ্বারাই সংঘটিত হয়ে থাকে। ফলস্বরূপ কিশোর গ্যাং কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মাঠপর্যায়ের মাদক ব্যবসা।
কিশোর গ্যাং বিভিন্ন কারণে হয়ে তৈরি হয়ে থাকে। পারিবারিক কলহ থেকে তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং। কোনো পরিবারে যদি নিয়মিত ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকে তখন সেই পরিবারে ছোট বাচ্চারা এসব দেখে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক সময় তারাই হয়ে উঠে কিশোর গ্যাং এর নিয়মিত সদস্য। সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং। কিশোর গ্যাং সৃষ্টির অন্যতম আরও একটি কারণ হলো মাদকাসক্ত। বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ তরুণ তরুণী মাদকে আসক্ত। মাদকের যোগান দিতে প্রয়োজন অর্থ। আর এই অর্থের যোগান দিতে চুরি, ছিনতায়, সন্ত্রাসী, ডাকাতিসহ, চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কাজ করতে হয়। এই কাজগুলোর বেশিরভাগ করে থাকে কিশোরা। সেখান থেকেও সৃষ্টি হচ্ছে কিশোর গ্যাং।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করা হচ্ছে কিশোর গ্যাং। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরির এক মাত্র কারণ হলো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার। রাজনৈতিক নেতারা তাদের নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে কিশোরদের দ্বারা নানা অপরাধ করাচ্ছে যা তাদের কিশোর গ্যাং এর দিকে ধাবিত করছে। এই অপরাধের কালো দিক থেকে যদি কিশোরদের ফিরিয়ে আনা না যায় তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
ভবিষ্যতে প্রজন্ম ধ্বংস মানে একটি জাতির ধ্বংস। কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারের যেমন পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তেমনি পরিবারেও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যেমন- সন্তানদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার এবং তাদের সামনে ঝগড়া-বিবাদ না করা ইত্যাদি। কিশোর গ্যাং রোধ করতে কিশোর আইনপ্রয়োগ করতে হবে। পারিবারিক এবং সামাজিক কলহ দূর করতে হবে। মাদকের সহজলভ্যতা দূর করতে হবে এবং প্রত্যেক কিশোর-কিশোরীকে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। তবেই কিশোর-কিশোরীরা ফিরে আসবে অপরাধের অন্ধকার দিক থেকে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে সুস্থ ও স্বাভাবিক এবং আগামীর বাংলাদেশ হবে উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধির।
তাহমিদুল হাসান আকন্দ
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ
