মুক্তচিন্তার রক্ষাকবচ : তোষামোদি নয় চাই সাহসী সাংবাদিকতা
ওসমান গনি
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গণতন্ত্রের সুউচ্চ মিনার এবং একটি সুস্থ সমাজ কাঠামোর প্রধানভিত্তি হলো- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা কোনো অলংকার নয়, বরং নাগরিক জীবনের এক অনিবার্য অধিকার। তবে এই অধিকারটি শুধু কাগজে-কলমে থাকলেই চলে না, একে বাস্তবে রূপ দিতে এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন একনিষ্ঠ ও নির্ভীক সাংবাদিকতা। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন তথ্যের অবাধ প্রবাহের পাশাপাশি বিভ্রান্তি এবং অপপ্রচারের সুযোগ বেড়েছে, তখন মতপ্রকাশের প্রকৃত পরিবেশ বজায় রাখতে ‘ভক্ত সাংবাদিক’ নয়, বরং সত্যের প্রতি একনিষ্ঠ এবং গণমানুষের প্রতি দায়বদ্ধ সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ভক্ত সাংবাদিক বলতে আমরা যদি সেইসব সংবাদকর্মীকে বুঝি যারা সত্যের পরিবর্তে কোনো বিশেষ পক্ষ বা আদর্শের অন্ধ আনুগত্য করেন, তবে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পক্ষান্তরে, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের আকুতি বুঝতে সক্ষম এমন সাংবাদিকতা আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষের চিন্তা, যুক্তি এবং অসন্তোষ প্রকাশের পথ সর্বদা উন্মুক্ত থাকে। কিন্তু মানুষ তখনই কথা বলতে সাহসী হয়, যখন সে জানে যে তার কথাগুলো সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত মাধ্যম রয়েছে। সাংবাদিকতা সেই মাধ্যম হিসেবে কাজ করে যা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একটি জীবন্ত সেতুবন্ধন তৈরি করে। যদি এই মাধ্যমটি শুধু নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির স্তুতি গাইতে ব্যস্ত থাকে, তবে সাধারণ মানুষের নিজস্ব চিন্তা বা ভিন্নমত প্রকাশের পথ স্থায়ীভাবে রুদ্ধ হয়ে যায়। একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজে ভিন্নমত থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং জরুরি। ভিন্নমতই নতুন চিন্তার জন্ম দেয় এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ করে দেয়।
যখন সাংবাদিকতা তার পেশাগত নিরপেক্ষতা হারিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ‘ভক্তিবাদে’ পর্যবসিত হয়, তখন সমাজের বিচিত্র স্বরগুলো হারিয়ে যায় এবং কেবল একতরফা বয়ান বা সরকারি ভাষ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রকারান্তরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরার শামিল। কারণ সাংবাদিক যখন কোনো নির্দিষ্ট পক্ষভুক্ত হয়ে যান, তখন তিনি শুধু সেই পক্ষের সুবিধাজনক তথ্যগুলোই প্রচার করেন এবং বাকি সব কিছুকে উপেক্ষা বা অবদমন করেন।
প্রকৃত সাংবাদিকতা আসলে একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং পেশা যেখানে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি চরম সাহসিকতার প্রয়োজন হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এমন সাংবাদিক প্রয়োজন যারা ক্ষমতার সুশীতল ছায়ায় না থেকে প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে সত্য কথা বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। সাংবাদিকের কাজ হওয়া উচিত দর্পণের মতো- সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা অসংগতি, সাধারণ মানুষের না বলা কষ্ট এবং প্রশাসনের ভুলত্রুটিগুলো স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলা। যখন কোনো সাংবাদিক তার পেশাদারিত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা বা দলীয় আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেন, তখন তিনি নিজের অজান্তেই সংবাদপত্রের মৌলিক স্বাধীনতার অপূরণীয় ক্ষতি করেন। এতে সাধারণ মানুষের আস্থা গণমাধ্যমের ওপর থেকে সম্পূর্ণ উঠে যায়। আর যখন মানুষ গণমাধ্যমের ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা নিজেদের মত প্রকাশে ভয় পায় বা চূড়ান্তভাবে নিরুৎসাহিত হয়। এভাবেই একটি সমাজের গণতান্ত্রিক চেতনা ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। তাই মতপ্রকাশের প্রাণভোমরা হলো- তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা এবং সাংবাদিকের আপসহীন নৈতিক অবস্থান।
আধুনিক বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব মানুষকে নিজের কথা বলার অনেক প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কেউ এখন নিজের মতামত দিতে পারেন। কিন্তু এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগণিত মতগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল, তথ্যনির্ভর এবং প্রভাবশালী রূপ দেওয়ার দায়িত্ব আজও পেশাদার সাংবাদিকতার কাঁধেই ন্যস্ত।
এই দায়িত্ব পালনে সাংবাদিককে হতে হয় নির্মোহ এবং নির্লিপ্ত। তাকে গভীরভাবে বুঝতে হয়, যে তার হাতে থাকা কলমটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার নয়, বরং তা সমাজের নিপীড়িত ও কণ্ঠহীন মানুষের একমাত্র হাতিয়ার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সার্থকতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটিও অনুভব করেন যে, তার কথা শোনার জন্য এবং তা বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একজন বিশ্বস্ত সাংবাদিক আছে। সেই সাংবাদিক যখন কোনো ঘটনার অনুসন্ধান করেন, তখন তাকে শুধু ঘটনার উপরিভাগ বা দৃশ্যমান রূপ দেখলে চলে না, বরং তার পেছনের গূঢ় সত্যটুকু বের করে আনতে হয়। এই সত্য অনুসন্ধানের পথটি মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ নয়; বরং এটি অনেক সময় জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর জন্য প্রয়োজন অদম্য চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সাংবাদিকতার ধ্রুপদী নীতিমালা ও নৈতিকতার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা।
আমাদের গভীরভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, সাংবাদিকতা শুধু একটি সাধারণ জীবিকা নয়, এটি একটি সুমহান সামাজিক ব্রত। এই ব্রতের মূল লক্ষ্য হলো যেকোনো মূল্যে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা এবং মিথ্যার প্রবল বিস্তারকে রোধ করা। যখন সাংবাদিকরা কোনো বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের তল্পিবাহক হয়ে পড়েন, তখন তারা প্রকারান্তরে সমাজকে গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেন।
কারণ অন্ধ আনুগত্য মানুষকে প্রশ্ন করতে বাধা দেয়, আর প্রশ্নহীন সমাজ কখনোই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন বা সৃজনশীল হতে পারে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো- নির্ভয়ে প্রশ্ন করার অধিকার। এই অধিকার বজায় রাখার জন্য সাংবাদিকদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়। তারা যদি নিজেরাই ভক্তিতে গদগদ হয়ে ক্ষমতার কাছে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেন, তবে সাধারণ মানুষ কার কাছে আশ্রয় পাবে? সুতরাং, মুক্ত আলোচনার ক্ষেত্র প্রশস্ত করার জন্য সাংবাদিকের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা ও দলীয় প্রভাবমুক্ত অবস্থান অপরিহার্য। সাংবাদিক যখন সত্যের পক্ষে অকুতোভয় অবস্থান নেন, তখন তার পেছনে পুরো সমাজ একতাবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং সেটাই মতপ্রকাশের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
বর্তমানের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তথ্যের চেয়ে অপতথ্য বা ‘ফেক নিউজ’ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই কঠিন সময়ে একজন সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা বহুগুণ বেড়ে যায়। সাংবাদিকতা যখন কোনো আদর্শের প্রতি অন্ধ অনুগত হয়, তখন তথ্য সেখানে কাটছাঁট করা হয়। এর ফলে জনমত ভুল পথে পরিচালিত হয়। মুক্ত চিন্তার বিকাশের জন্য মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানো জরুরি, যেন তারা সেই তথ্যের ভিত্তিতে নিজস্ব মতামত গঠন করতে পারে।
ভক্ত সাংবাদিকরা তথ্যকে আড়াল করে আবেগ বা অন্ধত্ব ছড়িয়ে দেয়, যা চিন্তাশীল সমাজ গঠনের পরিপন্থি। অথচ মতপ্রকাশের মূল নির্যাস হলো যুক্তি। সাংবাদিক যখন যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করেন, তখন তা সমাজকে শিক্ষিত করে তোলে। এই শিক্ষাই মানুষকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে এবং তাকে উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই সাংবাদিকতার মানদ- হতে হবে নৈতিকতা, কোনো ব্যক্তির প্রতি মোহ নয়।
একজন প্রকৃত সাংবাদিক শুধু সংবাদের ভাষ্যকার নন, তিনি ইতিহাসের সাক্ষী এবং সমাজের বিবেক। ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই কোনো দেশে সাংবাদিকতা কুক্ষিগত হয়েছে বা সাংবাদিকরা চাটুকারিতায় মগ্ন হয়েছেন, তখনই সেখানে স্বৈরতন্ত্রের উদয় হয়েছে এবং মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। বিপরীতক্রমে, যেখানে সাংবাদিকরা প্রবল প্রতাপশালীদের চোখের ওপর চোখ রেখে কথা বলেছেন, সেখানে মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার এই লড়াইয়ে সাংবাদিকের কলম হলো সবচেয়ে ধারালো তলোয়ার। এই তলোয়ারের ধার যদি কোনো বিশেষ আনুগত্যের মোড়কে ঢাকা পড়ে যায়, তবে তা দিয়ে আর অন্যায়ের জঞ্জাল পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না। সে কারণেই একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য নির্ভীক সাংবাদিকের কোনো বিকল্প নেই।
পরিশেষে বলা যায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য যে সুস্থ, স্বাভাবিক ও সৃজনশীল পরিবেশ মুক্ত চিন্তার রক্ষাকবচ : তোষামোদি নয়, চাই সাহসী সাংবাদিকতা প্রকাশের পথকে কণ্টকমুক্ত করতে এবং একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে এমন সাংবাদিকতার জয়গান গাওয়া প্রয়োজন যা ব্যক্তিপূজা নয়, বরং গণমানুষের পরম সত্য ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি আজীবন দায়বদ্ধ।
ওসমান গনি
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
