নির্বাচনি বিতর্ক প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই করার উত্তম পথ

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এই নির্বাচনে শুধু ব্যালট পেপারে সিল মারা নয়, বরং যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াটি হওয়া উচিত স্বচ্ছ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক। আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ পথচলায় বড় অভাবটি হলো ভোটার এবং প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি যুক্তিনির্ভর কথোপকথনের অনুপস্থিতি। উন্নত বিশ্বে নির্বাচনি বিতর্ক একটি ঐতিহ্যে পরিণত হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে যে বিতর্কের দাবি উঠেছে, তা নাগরিক সচেতনতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। যখন একজন নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের প্রশ্নের সম্মুখীন হন, তখন তার ভেতরকার প্রকৃত সত্তাটি বেরিয়ে আসে। এটি শুধু কথার লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন ও সক্ষমতার এক অগ্নিপরীক্ষা। অন্ধকারের গলিঘুঁজি পেরিয়ে আলোর পথে আসার জন্য এই ধরনের সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। যোগ্যতার প্রমাণ না দিয়ে চুপিসারে ক্ষমতার মসনদে বসা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য শুধু অন্ধকারের বার্তা নিয়ে আসে।

রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার আগে একজন নেতার গভীর প্রজ্ঞা ও মানসিক দৃঢ়তা থাকা একান্ত প্রয়োজন। নির্বাচনি বিতর্ক সেই মঞ্চ তৈরি করে দেয় যেখানে প্রার্থীর সহজাত বুদ্ধিমত্তা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়। পুঁথিগত বিদ্যা বা লিখিত ভাষণ পাঠ করে দেশ চালান সম্ভব নয়; বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নিয়ে যৌক্তিক সমাধান দেওয়ার সামর্থ্যই একজন প্রকৃত নেতার পরিচয়। ভোটাররা যখন দেখেন তাদের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী চাপের মুখেও অবিচল থেকে তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে কথা বলছেন, তখন নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি কোনো সস্তা জনপ্রিয়তা নয়, বরং মেধার লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্জিত সম্মান। নেতৃত্ব যখন মেধা ও প্রজ্ঞার মানদ-ে উত্তীর্ণ হয়, তখনই একটি দেশ সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার নিশ্চয়তা পায়।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের অক্সিজেন স্বরূপ। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পাল্টাপাল্টি চল থাকলেও মুখোমুখি বসে সেগুলোর উত্তর দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। নির্বাচনি বিতর্কের মাধ্যমে প্রার্থীরা যখন তাদের অতীতের কর্মকাণ্ড এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে একে অন্যের মুখোমুখি হন, তখন লুকোচুরির কোনো অবকাশ থাকে না। সাধারণ জনগণ যখন দেখেন তাদের করের টাকার হিসাব এবং রাষ্ট্রীয় নীতির অস্পষ্টতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হচ্ছে, তখন স্বচ্ছতার এক নতুন দুয়ার খুলে যায়। এটি শুধু নেতার জন্য পরীক্ষা নয়, বরং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি বহিঃপ্রকাশ। অন্ধকারে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে যুক্তি দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা বা ভুল স্বীকার করা একজন বড় মাপের নেতার বৈশিষ্ট্য।

জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নির্বাচনি বিতর্কের প্রভাব অপরিসীম। অধিকাংশক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ শুধু আবেগ বা বংশপরম্পরায় রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। কিন্তু যখন দুই বা ততোধিক দলের প্রধানরা স্ক্রিনের সামনে বসে দেশের জিডিপি, শিক্ষা ব্যবস্থা বা পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন, তখন সাধারণ ভোটাররাও বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। এই প্রক্রিয়াটি ভোটারদের একজন সমর্থক থেকে একজন বিচারকে পরিণত করে। নাগরিক যখন বুঝতে পারে যে তার ভোটটি শুধু একটি মার্কা নয়, বরং একটি আদর্শ ও পরিকল্পনার পক্ষে সায় দেওয়া, তখন গণতন্ত্রের প্রকৃত উদ্দেশ সফল হয়।

একটি নির্বাচনি বিতর্ক মূলত একটি বিশাল ক্যানভাস যেখানে ভোটাররা খুব সহজেই বিভিন্ন দলের ইশতেহার ও চিন্তাধারার তুলনা করার সুযোগ পান। আমরা প্রায়ই দেখি সব দলই প্রায় একই ধরনের শ্রুতিমধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। কিন্তু বিতর্কের মঞ্চে যখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ জানতে চাওয়া হয়, তখনই তাদের পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি কোনো রম্য নাটকের চেয়ে কম নয় যে, কীভাবে একজন নেতা তার অবাস্তব পরিকল্পনাকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ ভোটারদের বিভ্রান্তি দূর করে এবং তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। যখন হাতে কলমে প্রমাণের সুযোগ থাকে যে কার পরিকল্পনা বেশি বিজ্ঞানসম্মত এবং কার চিন্তা শুধু আবেগসর্বস্ব, তখন সঠিক প্রার্থী নির্বাচন করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

নির্বাচনি বিতর্ক গণতন্ত্রের শিকড়কে শক্তিশালী করে এবং সমাজে রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি করে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিরোধ মানেই রাজপথে সংঘর্ষ বা চরম বিদ্বেষ। কিন্তু যখন প্রধান দলগুলোর নেতারা একই মঞ্চে বসে একে অন্যের সঙ্গে করমর্দন করে যুক্তিতর্কে লিপ্ত হন, তখন তৃণমূলের কর্মীদের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছায় যে রাজনীতি মানে শত্রুতা নয়, রাজনীতি মানে মতের ভিন্নতা। এটি একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিতে।

একে অন্যের সমালোচনা করা সত্ত্বেও যে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব, তার সবথেকে বড় উদাহরণ হতে পারে এই বিতর্ক। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং যুক্তির মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা। যখন রাজপথের বদলে যুক্তি ও মেধা দিয়ে জয়ী হওয়ার মানসিকতা তৈরি হবে, তখনই দেশ প্রকৃত মুক্তির স্বাদ পাবে।

প্রচারের গতানুগতিক ধারায় মাইকিং আর পোস্টারের জোয়ারে আসল বক্তব্য হারিয়ে যায়। কিন্তু বিতর্কের মাধ্যমে প্রার্থীরা তাদের পরিকল্পনাগুলো আরও বিশদভাবে এবং সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পান। এটি শুধু একতরফা ভাষণ নয়, বরং দ্বিমুখী যোগাযোগের একটি সেতু। প্রার্থীরা যখন একে অন্যের ভুলগুলো ধরিয়ে দেন, তখন জনগণ মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখার সুযোগ পায়। এই প্রক্রিয়ায় মিথ্যে প্রচারণার ফাঁদ ছিঁড়ে সত্যের আলো বেরিয়ে আসে। সত্য গোপন করে জনগণের সমর্থন নেওয়ার দিন ফুরিয়ে আসছে; এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রতিটি শব্দ বিশ্লেষণ করা হয়। তাই যারা নির্ভীক এবং যাদের মধ্যে সত্য বলার সাহস আছে, তারাই এই মঞ্চে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন।

শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা করা একটি বিপজ্জনক কাজ। নির্বাচনি বিতর্কে যখন জটিল অর্থনৈতিক বা সামাজিক সংকট নিয়ে আলোচনা হয়, তখন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পূর্ব অভিজ্ঞতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি শুধু ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়, বরং বাস্তব সমস্যা সমাধানে অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ। একজন নেতার দূরদর্শিতা এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষমতা কতটুকু, তা তার যুক্তিপ্রদান ও তথ্য উপস্থাপনের ধরন দেখলেই বোঝা যায়। অভিজ্ঞতার অভাব থাকলে একজন নেতা যতই জনপ্রিয় হোন না কেন, রাষ্ট্রীয় সংকটে তিনি খেই হারিয়ে ফেলেন। বিতর্কের মঞ্চটি তাই প্রার্থীর যোগ্যতার একটি বিজ্ঞানসম্মত ‘পোস্টমর্টেম’ রিপোর্ট প্রদান করে।

নির্বাচনি বিতর্কে পরিকল্পনাগুলো যখন ব্যবচ্ছেদ করা হয়, তখন বোঝা যায় কার চিন্তা কতোটা আধুনিক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিতর্কের মাধ্যমে জনগণের সামনে উঠে আসে শিক্ষাখাতের সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নেতাদের প্রকৃত ভাবনা। নির্বাচনি বিতর্ক একটি শিক্ষণীয় প্রক্রিয়া যেখানে সাধারণ মানুষও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পরিকল্পনার বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে।

একজন নেতার সততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা শুধু তার মুখে নয়, তার বাচনভঙ্গি ও চোখের ভাষায়ও ফুটে ওঠে। নির্বাচনি বিতর্কের লাইভ সম্প্রচার চলাকালীন কোনো কৃত্রিমতা বা সাজানো নাটকের সুযোগ থাকে না। প্রার্থীর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলন তার বক্তব্যে পাওয়া যায়। তিনি কি শুধু নিজের দলের কথা ভাবছেন, নাকি গোটা জাতির কল্যাণ তার মূল লক্ষ্য?

পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিপ্লব প্রয়োজন। নির্বাচনি বিতর্ক সেই বিপ্লবের প্রথম ধাপ।

এটি শুধু এক রাতের অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির স্থায়ী ভিত্তি। যখন রাজনৈতিক দলগুলো জানবে যে তাদের প্রধানকে জনগণের সামনে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে, তখন তারা যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে বাধ্য হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে মেধা পাচার রোধে এবং রাজনীতিতে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। রাজনীতির ময়দান তখন পেশীশক্তি বা কালো টাকার বদলে মেধা ও যুক্তির লড়াইয়ে পরিণত হবে।

পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচনি বিতর্ক কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি ভোটারের নাগরিক অধিকার। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ আর অন্ধকারে থাকতে চায় না; তারা চায় তাদের হবু প্রধানমন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধিরা তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই ক্ষমতায় আসুক। ১২ই ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে যে বিতর্কের গুঞ্জন উঠেছে, তা বাস্তবায়ন করা একটি নৈতিক দায়িত্ব। চুপিসারে দেশ চালানোর দিন শেষ হয়েছে; এখন সময় সামনে এসে বুক চিতিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার। যদি আমরা একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করতে চাই, তবে বিতর্কের এই সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই হবে। একমাত্র সত্য ও মেধার চর্চাই পারে একটি জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে এনে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে। গণতন্ত্রের জয় হোক, যুক্তির জয় হোক।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল