নির্বাচন : জনমানুষের প্রত্যাশার প্রতিধ্বনি
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বা ভোট প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত ইচ্ছা, স্বপ্ন এবং আগামীর পথচলার মানচিত্র। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনমতই চূড়ান্ত শক্তি, আর সেই জনমতের প্রতিফলন ঘটে ব্যালট বাক্সে। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলো আয়নার মতো, যেখানে একটি দেশের মানুষের প্রকৃত প্রত্যাশা, ক্ষোভ এবং আশার ছবি ফুটে ওঠে। তাই বলা হয়, নির্বাচন মানুষের প্রত্যাশারই প্রতিধ্বনি।
সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন সাধারণ ভোটার যখন ভোটকেন্দ্রে যান, তিনি শুধু একজন প্রার্থীকে ভোট দেন না, বরং তিনি তার নিজের এবং তার পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যতের পক্ষে রায় দেন। খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, সুচিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের যে দাবিগুলো সারা বছর মানুষের মনে সুপ্ত থাকে, নির্বাচনের সময় তা এক প্রবল জোয়ারে রূপ নেয়। জনতা চায় এমন একটি নেতৃত্ব, যারা তাদের যাপিত জীবনের কষ্টগুলো বুঝবে এবং সমাধানের পথ দেখাবে। যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী জনগণের এই মৌলিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়, তখন নির্বাচনের ফলাফলে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে।
একটি নির্বাচন তখনই মানুষের প্রত্যাশার সঠিক প্রতিধ্বনি হতে পারে, যখন সেখানে সবার সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। ভয়ভীতিহীন পরিবেশ এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত। যদি ভোটাররা মনে করেন তাদের পছন্দের প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ নেই, তবে নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ মূলত ব্যবস্থার পরিবর্তন বা ধারাবাহিকতার পক্ষে রায় দেয়। এই রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান দায়িত্ব। জনগণের প্রত্যাশা হলো- নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ক্ষমতার দাপটে অন্ধ না হয়ে জনসেবায় নিজেদের উৎসর্গ করবেন।
নির্বাচন হলো একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের কাজের মূল্যায়ন। এটি একাধারে পুরস্কার এবং তিরস্কারের মঞ্চ। শাসকরা যদি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হন, তবে ব্যালটের মাধ্যমেই মানুষ তাদের অনাস্থা প্রকাশ করে। এই যে ‘পরিবর্তনের স্পৃহা’, এটাই নির্বাচনের মূল শক্তি। নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো চায় যেখানে আইনের শাসন থাকবে, দুর্নীতি দমন করা হবে এবং প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত হবে। মানুষের এই প্রত্যাশা যখন রাজনৈতিক ইশতেহারে গুরুত্ব পায় এবং পরবর্তীতে তার বাস্তবায়ন ঘটে, তখনই গণতন্ত্র পূর্ণতা পায়।
দুর্ভাগ্যবশত, অনেক সময় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যা সাধারণ মানুষের মনে হতাশা তৈরি করে। যখন নির্বাচনের ফলাফল সাধারণ মানুষের প্রকৃত মতামতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয় না, তখন রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্ব গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। মানুষের প্রত্যাশা হলো—নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে কাজ করবে, যাতে প্রতিটি ভোটের মর্যাদা রক্ষা পায়। মানুষ এমন একটি সমাজ চায় যেখানে তাদের কণ্ঠস্বর শুধু নির্বাচনের দিন নয়, বরং পরবর্তী পাঁচ বছরও সমানভাবে গুরুত্ব পাবে।
পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচন কোনো সাময়িক উৎসব নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের চাবিকাঠি। জনগণের নীরব ভাষায় যে প্রত্যাশাগুলো জমা থাকে, নির্বাচনের মাধ্যমেই তা উচ্চকিত হয়। একটি সফল নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে যদি নির্বাচনের সেই ‘জনপ্রত্যাশার প্রতিধ্বনি’ শোনা যায়, তবেই দেশ কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। জনগণের রায়কে শিরোধার্য করে একটি বৈষম্যহীন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করাই হোক প্রতিটি নির্বাচনের মূল লক্ষ্য।
