দেশের চাবি জনগণের কাছে, নিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা কার হাতে
এনআর খোরশেদ আলম রাজু
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে তালা-চাবির দায়িত্বে থাকে একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (পিয়ন)। সে শুধুমাত্র তালাচাবি সংরক্ষণের একজন কর্মী মাত্র। সে সব ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে না। তবে ইচ্ছা করলে সেই প্রতিষ্ঠান প্রধান, তালা-চাবির সংযোজন বিয়োজন এমনকি পরিবর্তনও করতে পারে। এ বিষয়ে সেই কর্মচারী (পিয়ন) কোনো প্রতিবাদ করলে তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন হবে বলে মনে হয় না। তবে সে বেশি বাকবিতন্ডা করলে তার অপসারণসহ নানামুখী ঝামেলায় ফেলতে কলকাঠি নাড়ার ক্ষমতা রাখে সেই প্রতিষ্ঠান প্রধান।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো- সেই রাষ্ট্রের জনগণ। জনগণই হলো সকল ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আদৌ কি তার বাস্তব প্রতিফলন দেখেছি? যুগে যুগে সাধারণ জনগণ শুধু লাঞ্চনা-বঞ্চনা আর পণ্যের মতো ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অজো পারাগায়ের সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাকার হয়ে খাল খনন কর্মসূচির মধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছরের (সম্ভবত ১৯৭৯-১৯৮০) মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টির বেশি খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল, যা সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছিল। বিআইআইএসএস জার্নালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৭৯-১৯৮১ সালের মধ্যে মোট ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়।
রিসার্চগেটের একটি দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, খাল খনন কর্মসূচির ফলে ১৯৮০ সালে খাদ্য উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। ডিটিআইসির তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচি গ্রামীণ স্বনির্ভরতা বাড়াতে সহায়ক ছিল। এতে বিভিন্ন এলাকার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল এবং কৃষি বিপ্লবের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ দৃঢ় করে। তবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এই কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে যায়। যদি এটি অব্যাহত থাকত, তবে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারত। বর্তমান যে কোনো সরকার ক্ষমতায় গেলে উচিত হবে, এই কর্মসূচি পুনরায় চালু করা। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে ফেনীর বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার একটি প্রধান কারণ সেখানকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার ধ্বংস হয়ে যাওয়া। এ ছাড়া দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণই ঠিক করে দেয়, কে দেশের দায়িত্ব নেবে, কে পরিচালনা করবে ভবিষ্যতের পথচলা। অর্থাৎ দেশের ‘চাবি’ মূলত জনগণের হাতেই থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই রাষ্ট্র পরিচালনার ‘পাসওয়ার্ড’ অর্থাৎ নীতিনির্ধারণ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে? নির্বাচনের দিন সাধারণ মানুষ যখন ভোটকেন্দ্রে যায়, তখন তারা শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন করে না; তারা তাদের আশা, স্বপ্ন ও নিরাপদ ভবিষ্যতের দায়িত্বও তুলে দেয় নির্বাচিত নেতৃত্বের কাছে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি তখনই নিশ্চিত হয়, যখন ক্ষমতার ব্যবহার হয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে বা ব্যক্তিনির্ভর হয়ে যায়। যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সীমিত কয়েকজনের মধ্যে আটকে থাকে, যদি মতপ্রকাশ সংকুচিত হয়, কিংবা প্রশ্ন করার পরিবেশ না থাকে তাহলে বোঝা যায়, চাবি জনগণের হাতে থাকলেও পাসওয়ার্ড অন্য কোথাও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের উপর।
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ, দায়িত্বশীল প্রশাসন এবং মুক্ত গণমাধ্যম এসবই হলো সেই নিরাপত্তা স্তর, যা নিশ্চিত করে নিয়ন্ত্রণ কোনো একক গোষ্ঠীর হাতে বন্দি না থাকে। কারণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে গণতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে দায় শুধু নেতৃত্বের নয়; নাগরিকদেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সচেতন ভোটার, সক্রিয় নাগরিক সমাজ এবং সত্যনিষ্ঠ গণমাধ্যম মিলেই তৈরি করে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি। জনগণ যদি তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে সাহসী ভূমিকা রাখে, তখনই প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের চাবি, পাসওয়ার্ড বা নিয়ন্ত্রণ যাই বলি না, কেন দুটোই জনগণের নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কোনো স্থির অর্জন নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিটি প্রজন্মকে এটি রক্ষা করতে হয় দায়িত্বশীল আচরণ ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, আমরা কি শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করছি, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও তুলছি?
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্যান্য নির্বাচনের চেয়ে অনেকটায় আলাদা। আলাদা এই কারনেই বলছি, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর একটি ক্ষমতাসীন দল ন্যায়-অন্যায় আর বৈষম্যের মধ্যদিয়ে এক নায়কতন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছিল। যেখানে প্রতিবাদ করলে জেল, জরিমানা, গুম, খুনসহ নানা অপরাধ করতে বিন্দুমাত্র কণ্ঠ কাঁপত না। ধাপে ধাপে তার বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন গড়ে উঠলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি। তবে চাকরির বয়সসীমাকে কেন্দ্র করে যে বৈষম্য তৈরি করেছিল, তারই প্রেক্ষিতে ঢাকাসহ পুরো দেশের ছাত্রসমাজ রাস্তায় নেমে আসে। ধীরে আন্দোলন আরও তীব্র থেকে তীব্রতর অবস্থায় রূপ নিলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষও রাস্তায় নেমে আসে। কঠিন তোপের মুখে পড়ে ৫ আগস্ট পালিয়ে যেতে ব্যাধ্য হয় সৈরশাসক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পিত হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর। তিনি নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা শতভাগ আশার আলো দেখেনি।
গণঅভ্যূত্থান-পরবর্তী সময়ে নির্বাচন নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে কেন্দ্র করে চলেছে নানা জল্পনা-কল্পনা। সেই জল্পনা-কল্পনার অবসান হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে। এই নির্বাচনে সাধারণত দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হবে, একটি প্রতীকী এবং একটি হ্যাঁ এবং না ভোট। এই হ্যাঁ এবং না ভোট নতুন প্রজন্মসহ অনেকেই বুঝে না, তার জন্য নানাভাবে প্রচার-প্রচারণাও করা হয়েছে। সেই সঙ্গে হ্যাঁ ভোট দিলে জনগণ কি উপকারিতা পাবে তা স্পষ্ট করে উপস্থাপনও করা হয়েছে। যা সব শ্রেণি পেশার মানুষের সুপ্ত চেতনার বাস্তব উপস্থাপন। এই হ্যাঁ এবং না ভোটের স্লোগান হলো দেশের চাবি জনগণের হাতে। আমিও সহমত দেয়।
তবে আমি স্পষ্ট বলতে চায় দেশের চাবি জনগণের হাতে এটি শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং একটি অঙ্গীকার। আর পাসওয়ার্ড বা নিয়ন্ত্রণ যেন জনগণের আস্থা, অধিকার ও আইনের শাসনের মধ্যেই সুরক্ষিত থাকে, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা। কারণ চাবি, পাসওয়ার্ড বা নিয়ন্ত্রণ যখন একই মালিকানায় থেকেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়, তখনই গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে নিরাপদ। গণতন্ত্রের শরীরে না পড়ুক কোনো কালো মন্ত্র, গণতন্ত্র উজ্জীবিত হোক তার স্বাধীন মহিমায়। এমনটাই চাওয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আপামর জনতার।
এনআর খোরশেদ আলম রাজু
লেখক ও সাংবাদিক
