প্রান্তিক মানুষের লড়াই ও অস্তিত্বের সংকট
আব্দুল কাদের জীবন
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের অর্থনীতির চাকা যাদের ঘামে ঘোরে, তারা আজ ভীষণ অসহায় হয়ে মুক্তির প্রহর গুনছে। নদীপাড়ের জেলে থেকে শুরু করে উত্তরের বিস্তীর্ণ মাঠের কৃষক- সবার জীবনকাহিনির সুর যেন একই দুঃখের কাহিেিত গাঁথা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা যে ফসল বা মাছ উৎপাদন করছেন, তার সুফল ভোগ করছে শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অট্টালিকায় বসে থাকা একদল মধ্যস্বত্বভোগী এবং বৃহৎ কর্পোরেট দানব। পুঁজির এই আগ্রাসনে আজ আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে।
বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তের কৃষকরা বছরজুড়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফলান হরেক রকমের ফসল। কিন্তু ফসল কাটার মৌসুম এলেই তাদের মুখে হাসি উবে যায়। হাটে-বাজারে ওঁতপেতে থাকে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট বা ‘দুষ্টচক্র’। এই চক্রটি কৃষকের নিরুপায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে পানির দরে পণ্য কিনে নেয়। ফলে উৎপাদন খরচটুকু তুলতে গিয়েই কৃষকের দম বন্ধ হয়ে যায়।
বিপরীতে, বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সেই কাঁচামাল কিনে নিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডের মোড়কে সাজিয়ে বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে চড়া দামে। কৃষক যে আলু বা চাল নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হলেন, সাধারণ ভোক্তাকে তা কিনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি দামে। মাঝখান থেকে লাভ লুটে নিচ্ছে পুঁজিপতিরা, আর লোকসানের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই অন্নদাতা কৃষক। কবিগুরুর সেই কালজয়ী উক্তি যেন আজও সত্য- ‘বুঝেছ উপেন, এই জমি লইব কিনে।’ আজ জমি শুধু কাড়ছে না, শ্রম ও ন্যায্য অধিকারও কেড়ে নিচ্ছে আধুনিক পুঁজিদানবরা।
নদী আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ। নদীপাড়ের জেলেরা বংশপরম্পরায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। শীতকালে যখন নদীর বুকে চরের পানি নেমে যায়, সেখানে বিস্তীর্ণ মাঠে কৃষক ফসলের স্বপ্ন বোনেন। কিন্তু সেই স্বপ্নও বাজারে গিয়ে ধূলিসাৎ হয় দালালের খপ্পরে পড়ে। একসময় আমাদের পাড়ায় পাড়ায় শত শত মুদি দোকান ছিল। এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল লাখ লাখ পরিবারের আহার। কিন্তু আজ সুপার শপ এবং বড় কোম্পানিগুলোর প্যাকেটজাত পণ্যের দাপটে সেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অসহায়। ঠিক একইভাবে, স্থানীয় কাঠমিস্ত্রি বা আসবাবপত্রের কারিগরদের কদর আজ শেষ হয়ে আসছে। মানুষ এখন ব্র্যান্ডের শো-রুমের চাকচিক্য পছন্দ করে, অথচ এই কর্পোরেট আগ্রাসনের নিচে চাপা পড়ছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় শিল্প ও কারিগরদের জীবন। বড় পুঁজি আজ রাক্ষুসে মাছের মতো ছোট পুঁজিকে গিলে খাচ্ছে।
বিশ্ব সভ্যতার ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েছে শ্রমিক-কৃষকের ঘামে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, পুঁজিবাদ যত বিকশিত হয়েছে, এই শ্রমজীবী মানুষগুলো তত বেশি অবহেলিত হয়েছে। কর্পোরেট জায়ান্টরা আজ শুধু বাজার দখল করেই ক্ষান্ত নয়, তারা প্রান্তিক মানুষের অধিকার হরণ করে তাদের প্রতি ‘দয়া’ দেখানোর মেকি নাটকও করছে। কিছু সেলাই মেশিন বিতরণ বা নামমাত্র নগদ সাহায্য দিয়ে তারা প্রান্তিক মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিতে চায়। এটি হলো তাদের অধিকারের কথা তাদের মন থেকে মুছে ফেলার নীলনকশা। একে বলা যেতে পারে ‘মুলা দেখানো’ রাজনীতি। যে অর্থের পাহাড় তারা গড়েছে প্রান্তিক মানুষের রক্ত চুষে, সেই অর্থের অতি সামান্য অংশ দাতব্য কাজে খরচ করে তারা নিজেদের সমাজসেবক হিসেবে জাহির করছে। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, এই মানুষগুলোর ন্যায্য পাওনা ও অধিকার যদি রাষ্ট্র নিশ্চিত করত, তবে তাদের আজ কারও অনুদানের মুখাপেক্ষী হতে হতো না।
একজন কৃষকের বা জেলেরও স্বপ্ন থাকে তার সন্তানকে শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করার। কিন্তু অঢেল পুঁজির এই দাপটে তার সেই সাধারণ স্বপ্নটুকুও আজ বিলাসিতা। ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ধারদেনার জালে জড়িয়ে পড়ে তারা বাবা-মায়ের চিকিৎসা করাতে পারেন না, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে পারেন না। শহরের বহুতল ভবনের চাকচিক্যের নিচে এই হাহাকারগুলো ঢাকা পড়ে যায়। আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার বুলি শোনা গেলেও, সেই শক্তির উৎস যারা- সেই প্রান্তিক মানুষরা এখনও বাস করছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’- এই প্রবাদটি আজ বহু মানুষের রূঢ় বাস্তবতা।
পুঁজির এই অসম দাপট থেকে প্রান্তিক মানুষকে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। শুধু গুটিকয়েক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন নয়। টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন মাঠপর্যায়ের প্রতিটি কৃষক ও শ্রমিক তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন।
বাজার সিন্ডিকেট নির্মূল : স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কঠোর হাতে দমন করতে হবে। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে সরাসরি কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
কর্পোরেট দায়বদ্ধতা : বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তাদের মুনাফার সুষম বণ্টন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহাবস্থানের নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
ক্ষুদ্র ঋণের পরিবর্তে ন্যায্য অধিকার : প্রান্তিক মানুষকে দয়া বা দান নয়, বরং তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। সুলভমূল্যে কৃষি উপকরণ এবং ন্যায্য বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার দিতে হবে।
শহুরে চাকচিক্য আমাদের চোখ রঙিন করে দিলেও মনে রাখতে হবে, আমাদের শেকড় পড়ে আছে গ্রামের সেই ধূলিমাখা মেঠোপথে। আমাদের পায়ে আজও কর্দমাক্ত মাটির গন্ধ লেগে আছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তন না হলে দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধি শুধু একটি ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। রাষ্ট্রকে আজ দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে- সে কি গুটিকয়েক পুঁজিপতির পক্ষে থাকবে, নাকি কোটি মানুষের অন্নের সংস্থান করা এই সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবে?
আব্দুল কাদের জীবন
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
