বিশ্বের মানচিত্রে কোথায় মানবতা বসবাস করে
আরশী আক্তার সানী
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ যখন বিশ্বমানচিত্র ধরে, তখন তার চোখে প্রথম ধরা পড়ে দেশগুলোর বর্ডার, মহাদেশের আকার, সমুদ্রের বিস্তৃতি, দ্বীপের ছড়াছড়ি। মানচিত্র পৃথিবীর ভৌত রূপটা বড় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে কোথায় যুদ্ধ, কোথায় বন্দর, কোথায় ঘন জঙ্গল সব যেন সেখানে আঁকা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়টিই মানচিত্রে নেই। মানবতা যা দিয়ে পৃথিবীকে সত্যিকার অর্থে ‘মানুষের পৃথিবী’ বলা যায় তার কোনো রেখা নেই, কোনো চিহ্ন নেই, কোনো দেশনাম নেই। এই অনুপস্থিতিই আমাদের মনে প্রশ্ন তোলে পৃথিবীর মানচিত্রে কোথায় মানবতার ঠিকানা?
মানবতা আসলে এমন কোনো বস্তু নয়, যাকে জমির মতো মাপা যায়, রাজনৈতিক রেখার মতো ভাগ করে রাখা যায়। মানবতা হচ্ছে মানুষের গভীরতম অনুভূতি, সহমর্মিতা, ত্যাগ, মমতা এবং বিবেকের সম্মিলিত এক অকৃত্রিম শক্তি। মানচিত্রে যেমন সীমান্তের রেখা দেখা যায়, মানবতার রেখা সেইভাবে দেখা যায় না কারণ এটি মানুষের অন্তরে আঁকা থাকে। মানুষের প্রতিটি সিদ্ধান্তের মধ্যে, প্রতিটি আচরণের মধ্যে, প্রতিটি সম্পর্কের ভেতরে মানবতা তার ছাপ রেখে যায়।
অনেকেই মনে করেন মানবতা বড় কোনো ঘটনায় প্রমাণিত হয় যেমন যুদ্ধবিরতি, শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া, অপারেশন চালিয়ে জীবন রক্ষা করা কিন্তু বাস্তবে মানবতা শুরু হয় খুব সাধারণ জায়গা থেকে। পথে হাঁটতে হাঁটতে কেউ হোঁচট খেলে তাকে উঠিয়ে দেওয়ার মুহূর্তে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধ মানুষটির হাত ধরে রাস্তা পার করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে, ক্ষুধার্ত মানুষকে নিজের খাবারের অংশ দেওয়ার অভ্যাসে মানবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ছোট ছোট দৈনন্দিন মুহূর্তগুলোই পৃথিবীর মানবতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এগুলো হয়তো নিউজ হেডলাইন হয় না, কিন্তু মানুষের মনে অদৃশ্য এক উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায় মানবতা কখনও সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি। নানা যুদ্ধ, মহামারি, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা পৃথিবীকে ক্ষতবিক্ষত করলেও মানবতা প্রতিবারই নিজেকে পুনর্গঠিত করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ যখন ধ্বংসের সামনে দাঁড়িয়েছিল, তখন কোথাও কোনো পরিবার শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছিল, কেউ গোপনে অন্য ধর্মের মানুষকে রক্ষা করছিল, কেউ নিজের খাদ্য বাঁচিয়ে ক্ষুধার্ত শিশুকে দিচ্ছিল। মানবতার শক্তি হলো এটি নীরবে কাজ করে, নরম ভঙ্গিতে এগিয়ে আসে। তাই অনেক সময় মানুষ মানবতার উপস্থিতি দেখতে পায় না, কিন্তু যখন প্রয়োজন পড়ে, তখন সেটি সবচেয়ে বেশি জ্বলে ওঠে।
আধুনিক পৃথিবীতে প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই মানুষ মনে করছে মানবতা নাকি হারিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের তর্ক-বিতর্ক, কটূক্তি, বিভাজন, অপমান এসব দেখে অনেকেই হতাশ হয়ে যায়। কিন্তু সত্য হলো, মানুষের ডিজিটাল আচরণ তার প্রকৃত আচরণের পূর্ণচিত্র নয়। অনলাইনে মানুষ যতটা কঠোর, বাস্তবে তা নয়। বাস্তব পৃথিবীতে এখনও অসংখ্য মানুষ চুপচাপ একে অপরের পাশে দাঁড়ায়। হাসপাতালে অপেক্ষমাণ অচেনা রোগীর জন্য রক্ত দিতে এগিয়ে আসে কেউ, বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে বৃদ্ধদের সঙ্গে কথা বলে কেউ, পথশিশুকে দুপুরের খাবার কিনে দেয় আরেকজন। এরা কেউ বিখ্যাত নয়, কিন্তু মানবতার নীরব সৈনিক।
মানবতার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এটি সীমান্ত মানে না। মানুষ হয়তো নিজের দেশে গর্ববোধ করে, নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে আবেগী হয়, কিন্তু মানবতা এসবের বাইরেও এক অদ্ভুত বন্ধন তৈরি করে। বাংলাদেশের কেউ পাকিস্তানি বন্যার্তদের জন্য অর্থ পাঠায়, ইউরোপের কোনো তরুণ আফ্রিকার ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায়, সিরিয়ার একটি শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ে আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষ তার জন্য প্রার্থনা করে এইসব ছোট ছোট কাজেই মানবতার ব্যাপ্তি আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। আমরা ভৌগোলিক সীমানায় বন্দী হলেও মানবতা কখনোই বন্দী নয়।
মানবতার আসল জন্মস্থান হলো পরিবার। পরিবারের ভেতরেই মানুষ প্রথম শিখে কীভাবে অন্যকে ভালোবাসতে হয়, কাকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, কষ্ট পেলে পাশে দাঁড়াতে হয়। মায়ের স্পর্শ, বাবার পরিশ্রম, ভাই-বোনের ঝগড়াঝাঁটিতে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা এগুলোই মানবতার বীজ। যখন পরিবার, বন্ধুমহল, প্রতিবেশী সমাজ সব মিলিয়ে একটি সমষ্টি মানবিকভাবে গড়ে ওঠে, তখন পুরো সমাজেই মানবতার ছাপ তৈরি হয়।
তবে মানবতা শুধু কাছের মানুষের জন্যই নয়; মানবতার আসল শক্তি হচ্ছে এটি অপরিচিতের জন্যও কাজ করে। আমরা যার নাম জানি না, যার পরিচয় জানি না তার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তই মানবতার শ্রেষ্ঠ রূপ। যে মানুষ নিজের স্বার্থ বাদ দিয়ে অন্যকে বাঁচানোর জন্য ঝুঁকি নেয়, সে কোনো দেশের, কোনো ধর্মের নয় সে মানবতার নাগরিক।
মানচিত্রে তাই মানবতা নেই কারণ মানবতা ঠিকানা খুঁজে পায় মানুষের হৃদয়ে। মানুষের ভেতরের সৎ ইচ্ছা, মানুষের গভীর চিন্তা, মানুষের নৈতিক সিদ্ধান্ত এসবের ভেতরে মানবতা বাড়ে, ছড়িয়ে পড়ে, আবার কখনও ক্ষীণ হয়। কিন্তু দৃষ্টির আড়ালে থেকেও মানবতা সবসময় সক্রিয় থাকে। পৃথিবীর কোথাও কোনো মানুষ কাঁদলে, কোথাও কোনো মানুষ তাকে সান্ত¡না দেয় এই অদৃশ্য সম্পর্কই মানবতার প্রকৃত ভূগোল।
মানবতা কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি মানুষের আচরণের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। মানুষ যত বেশি উদার হয়, মানবতা তত বিস্তৃত হয়। মানুষ যত বেশি সংকীর্ণ হয়, মানবতা তত সংকুচিত হয়। তাই মানবতার প্রকৃত অবস্থান পৃথিবীর কোনো মানচিত্রে নয় বরং প্রত্যেক মানুষের বিবেকের মানচিত্রে। এই মানচিত্র প্রতিদিন নতুনভাবে আঁকা হয়, নতুন করে সংশোধিত হয়, আবার কখনও নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়।
মানুষ যতদিন মানুষের জন্য, মানুষ যতদিন অনুভূতির জন্য, মানুষ যতদিন সহমর্মিতার জন্য বাঁচবে মানবতা ততদিন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান বাসিন্দা হয়ে থাকবে। পৃথিবীর ভৌগোলিক মানচিত্রে তার কোনো জায়গা নেই, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের মানচিত্রে রয়েছে সবচেয়ে উজ্জ্বল স্থান।
আরশী আক্তার সানী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
