তীব্র হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মানবিক সংকটের বয়স এখন ৭ বছর ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৭ সালে যখন নাফ নদী পেরিয়ে নারী-শিশু-বৃদ্ধের স্রোত বাংলাদেশে ঢুকেছিল, তখন বিশ্ববিবেক কেঁদে উঠেছিল। বাংলাদেশ সরকার মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সেই মানবিকতা বাংলাদেশের জন্য এক দুঃসহ ভারে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট শুধু দীর্ঘায়িত হয়নি, বরং এটি এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ হুমকিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো- তাদের নিরাপদ, সসম্মানে এবং স্থায়ীভাবে নিজ বাসভূমি রাখাইনে ফিরে যাওয়া। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিক চুক্তি ও আলোচনা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন শূন্য। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার বারবার নানা অজুহাতে এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ওপর যে ধরনের কার্যকর চাপ প্রয়োগ করা প্রয়োজন ছিল, তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিশেষ করে বিশ্বশক্তির প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও দ্বিমুখী অবস্থান এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অপরাধের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে। সেখানে দিন দিন বাড়ছে খুন, অপহরণ, মাদক ব্যবসা এবং মানবপাচার। আরসা (ARSA) বা আরএসও (RSO)-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই সাধারণ রোহিঙ্গাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে ক্যাম্পগুলোতে এক ভয়ারহ অরাজকতা বিরাজ করে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও ঘনবসতিপূর্ণ এই ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এই অস্থিরতা শুধু ক্যাম্পের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, এটি স্থানীয় বাংলাদেশি জনপদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও নষ্ট করছে।
রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ ত্রাণের প্রবাহ ছিল, বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিন সংকটের মতো বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দাতাগোষ্ঠীর মনোযোগ এখন অন্যদিকে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এরইমধ্যে রোহিঙ্গাদের মাসিক খাদ্য বরাদ্দ কয়েক দফায় কমিয়ে দিয়েছে। একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে তাদের মধ্যে উগ্রবাদ ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা সহায়তায় কাটছাঁট করা বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টির শামিল।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি রোহিঙ্গা সংকটকে নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র মধ্যে চলমান সংঘর্ষে রাখাইন এখন রণক্ষেত্র। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও অনেক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছে। আরাকান আর্মি এখন রাখাইনের বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে তাদের অবস্থান এখনও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের জন্য নতুন করে কূটনৈতিক রণকৌশল নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কেবল মৌখিক আশ্বাস বা প্রটোকল বজায় রাখলে চলবে না। এখন প্রয়োজন কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। মিয়ানমারকে কার্যকরভাবে বাধ্য করতে জাতিসংঘ, আসিয়ান (ASEAN) এবং বিশেষ করে চীন ও ভারতকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে আন্তর্জাতিক ঐক্য প্রয়োজন। রাখাইনে যেহেতু এখন আর জান্তা সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই অপ্রাতিষ্ঠানিক বা কৌশলগত উপায়ে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা যেতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সহজ হয়। ক্যাম্পগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সমন্বিত অভিযান জোরদার করতে হবে। অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে যাতে সাধারণ রোহিঙ্গারা অপরাধী চক্রের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। জেআরপি (Joint Response Plan)-এর অধীনে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য দাতা দেশগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক উদ্বেগের বিষয় নয়, এটি একটি বিস্ফোরক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যু। ১১ লাখ মানুষের জীবন এভাবে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় ঝুলে থাকতে পারে না। বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ধৈর্য ধরেছে, কিন্তু সেই ধৈর্যের বাঁধ এখন ভাঙার পথে। বিশ্বনেতৃত্ব যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই সংকট দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু সমাধান এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখন কথা নয়, বরং দৃশ্যমান পদক্ষেপই কাম্য।
