জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে গণভোটে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’
আরিফুল ইসলাম রাফি
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই কেবল একটি মাসের নাম নয়, এটি ক্যালেন্ডারের পাতায় ঠাঁই নেওয়া ৩১টি দিনের সমষ্টিও নয়; জুলাই মানে প্রত্যাশা, জুলাই মানে অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি, জুলাই মানে রাষ্ট্রকে নতুন করে কল্পনা করার সাহস। এই সাহসের সামনে আজ একটি প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে, গণভোটে আমরা কী বলব? ‘হ্যাঁ’, নাকি ‘না’?
এই প্রশ্ন শুধু একটি ব্যালট পেপারের প্রশ্ন নয়। এটি ভবিষ্যতের কাছে আমাদের দায় স্বীকার করার প্রশ্ন। আমরা কি বলতে পারব, যে স্বপ্ন একদিন রাস্তায় জন্ম নিয়েছিল, তাকে আমরা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি? নাকি আমরা বলব, সুযোগ ছিল, কিন্তু আমরা দ্বিধায় ছিলাম? গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আমরা পরিবর্তন চাই, আমরা সংস্কার চাই, আমরা এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো চাই যেখানে ক্ষমতা প্রশ্নহীন নয়, জবাবদিহিমূলক। জাতির সামনে এমন একটি মুহূর্ত এসেছে, যখন সিদ্ধান্ত মানে শুধু বর্তমানকে বেছে নেওয়া নয়, বরং ভবিষ্যতের কাছে নিজের পরিচয় নির্ধারণ করা। আমরা কেমন দেশ চাই, ক্ষমতা কেমনভাবে ব্যবহৃত হোক চাই, প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হবে- এসব প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া যাবে না, কিন্তু কিছু দিন থাকে যেদিন সেই উত্তর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
গণভোট তেমনই একটি দিন। জুলাই যে অস্থির আলো জ্বালিয়েছিল, গণভোট তার স্থায়ী রূপ দেওয়ার সম্ভাবনা। আমরা বহু বছর ধরে উন্নয়নের গল্প শুনেছি, সাফল্যের তালিকা দেখেছি, অগ্রগতির মাইলফলক উদযাপন করেছি। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের মনে আরেকটি প্রশ্নও জমেছে, এই রাষ্ট্রে আমার কণ্ঠস্বর কতটা মূল্যবান? আমার ভোট কি সত্যিই সিদ্ধান্তে রূপ নেয়? আইন কি সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে? প্রতিষ্ঠানগুলো কি ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে দাঁড়াতে পারে? এই প্রশ্নগুলো নিছক বিরোধিতার ভাষা নয়; এগুলো নাগরিক চেতনার লক্ষণ। যখন মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, তখনই গণতন্ত্র বেঁচে ওঠে।
‘হ্যাঁ’ ভোটের ভেতরে তাই কেবল সমর্থন নেই, আছে একটি স্বীকারোক্তি, আমরা বুঝতে পারছি যে কাঠামোকে সময়ের সাথে নতুন করে সাজানো দরকার। পুরোনো ব্যবস্থার সাফল্য থাকতে পারে, কিন্তু সীমাবদ্ধতাও থাকে। সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, নাগরিক প্রত্যাশা বদলেছে; রাষ্ট্র যদি সেই বদলের সাথে তাল না মেলায়, তাহলে দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্বই একদিন ক্ষোভে, অবিশ্বাসে, অস্থিরতায় রূপ নেয়। জুলাই ছিল সেই জমে ওঠা দূরত্বের প্রকাশ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সঙ্গে সঙ্গে কোনো জাদুকরী পরিবর্তন নেমে আসবে তা ঠিক, তবে এটি শুরু করবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা। জনগণ বলবে, আমরা সংস্কারের পথে হাঁটার অনুমতি দিচ্ছি। এরপর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায় হবে সেই ইচ্ছাকে আইনি ও সাংবিধানিক রূপ দেওয়া। ক্ষমতার বণ্টন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, নজরদারির ব্যবস্থা, নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা- সবকিছুকে নতুন চোখে দেখা হবে। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ মানে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া নয়; ‘হ্যাঁ’ মানে সঠিক পথে যাত্রা শুরু। এই যাত্রার গুরুত্ব কোথায়? গুরুত্ব সেখানে, যেখানে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র চাই, কিন্তু একই সঙ্গে চাই রাষ্ট্র যেন নাগরিকের ভয় না হয়ে তার ভরসা হয়। আমরা চাই নির্বাচন এমন হোক, যার ফল নিয়ে পরদিনই মানুষ বিতর্কে না জড়ায়। আমরা চাই আদালত এমন জায়গা হোক, যেখানে দুর্বল মানুষও শক্তিশালীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস পায়। আমরা চাই সংসদে মতের ভিন্নতা থাকুক, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন রাষ্ট্রকে পক্ষাঘাতে না ফেলে বরং সমাধানের পথ খুলে দেয়। এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে গেলে নিয়ম বদলাতে হয়, প্রক্রিয়া বদলাতে হয়, কখনও কখনও ক্ষমতার স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করতেও হয়। ‘হ্যাঁ’ সেই কঠিন কাজটি করার সাহস জোগায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন দরকার আরেকটি কারণে। আমরা একটি তরুণ রাষ্ট্র, আমাদের জনসংখ্যার বড় অংশই যুব। তাদের আকাঙ্ক্ষা দ্রুত, তারা ফল দেখতে চায়, তারা তুলনা করে বিশ্বমানের সঙ্গে। যদি রাষ্ট্রের কাঠামো তাদের সেই গতির সঙ্গে তাল না মেলাতে পারে, তারা হতাশ হবে। হতাশা কোনো জাতির জন্য ভালো সংবাদ নয়। সংস্কার মানে তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধরে রাখার চেষ্টা। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া প্রয়োজন কারণ এটি রাজনৈতিক দলগুলোকেও একটি বার্তা দেয়, জনগণ কাঠামোগত উন্নতি চায়। ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, তাকে এই প্রত্যাশা মানতে হবে।
এটি ব্যক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার দিকে ঠেলে দেয়। আর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনে। আমরা যদি ভেবে দেখি, স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের অনেক অর্জন এসেছে, কিন্তু প্রতিটি অর্জনের পেছনে ছিল পরিবর্তনের সাহস। ভাষার প্রশ্নে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে, অধিকারের প্রশ্নে আমরা দাঁড়িয়েছি। আজকের গণভোট সেই ধারাবাহিকতারই আরেক অধ্যায়। এখানে ‘হ্যাঁ’ বলা মানে অতীতকে অস্বীকার করা নয়; বরং সেই ইতিহাসের স্বাভাবিক বিকাশকে স্বীকৃতি দেওয়া।
জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখা মানে কেবল স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা নয়, বরং সেই চাওয়াকে আইন ও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে জায়গা করে দেওয়া। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সেই জায়গা তৈরি করার দরজা খুলে দেয়। নিখুঁত হবে না, বিতর্ক থাকবে, সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে; তবুও এগোতে হবে। কারণ থেমে থাকা মানে স্বপ্নকে ধীরে ধীরে মরে যেতে দেওয়া। ‘হ্যাঁ’ তাই একটি আশাবাদী শব্দ। এটি বিশ্বাস করে মানুষ বদলাতে পারে, রাষ্ট্র শিখতে পারে, ভবিষ্যৎ নতুনভাবে লেখা যায়। জুলাই আমাদের যে সাহস শিখিয়েছিল, গণভোটে সেই সাহসের শান্ত, পরিণত প্রকাশ ঘটানোর সময় এখন।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
