কেমন ছিল ভোটের দিনগুলো : কেমন হওয়া চাই ১২ ফেব্রুয়ারি
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গণতন্ত্রের উৎস হলো জনমত, আর সেই জনমত প্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো নির্বাচন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি লড়াইয়ের পেছনে ছিল স্বাধিকার ও ভোটাধিকারের আকাঙ্ক্ষা। তবে স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাস সবসময় মসৃণ ছিল না। গত পাঁচ দশকে আমরা একদিকে যেমন দেখেছি ভোটারের দীর্ঘ লাইন, উৎসবমুখর পরিবেশ আর সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে প্রত্যক্ষ করেছি জাল ভোট প্রদান, ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মতো নেতিবাচক অধ্যায়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আমাদের অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রস্তুতি নিতে হবে।
একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রাণস্পন্দন হলো তার নির্বাচন ব্যবস্থা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘ভোট’ শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি সামাজিক উৎসব, মনস্তাত্ত্বিক অধিকার আদায়ের লড়াই এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতার চাবিকাঠি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই ভূখণ্ডে ভোটাধিকার ছিল গণতন্ত্রের মূলভিত্তি। বিগত ৫৩ বছরে আমরা অনেকগুলো সাধারণ নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছি। কোনোটি ছিল উৎসবমুখর, কোনোটি সহিংসতায় ঢাকা, আবার কোনোটি ছিল ইতিহাসের বাঁকবদল। ভোটারের দীর্ঘলাইন, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ততা যেমন আমাদের আশাবাদী করেছে, তেমনি জাল ভোট বা পেশিশক্তির অপব্যবহার আমাদের লজ্জিত করেছে। একটি জাতির নৈতিকতা ও দেশাত্মবোধের প্রতিফলন ঘটে তার ভোটদানের ধরণে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি যেমন পূর্ণ, তেমনি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঘিরে আমাদের প্রত্যাশার পারদও আকাশচুম্বী।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তখন দেশাত্মবোধ ছিল তুঙ্গে। রাজনৈতিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেই দিনটি ছিল মূলত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। মানুষের মনে ছিল অদম্য উৎসাহ, নির্ভুল ভোটার তালিকার চেয়েও বড় ছিল মানুষের আবেগ। বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ থাকলেও দিনটি ছিল উৎসবমুখর।
১৯৭৯ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনামলে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ঘটে। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এতে সরকারি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ স্থিতিশীলতার আশায় ভোট দিয়েছিল।
১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে এরশাদ আমলের এই দুটি নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক বড় পরীক্ষা। ১৯৮৬ সালে আংশিক অংশগ্রহণ থাকলেও ১৯৮৮ সালে প্রধান দলগুলো ভোট বর্জন করে। ভোটের দিন কেন্দ্রগুলো ছিল জনশূন্য। নেতিবাচক পয়েন্ট হিসেবে ‘ভোটকেন্দ্র দখল’ এবং ‘জাল ভোট’ এই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় বলে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন।
১৯৯১ সালে এরশাদ এর পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ছিল নিরপেক্ষতার মূর্ত প্রতীক। ভোটের দিন ছিল শান্তিপূর্ণ। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স না থাকলেও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ একটি ‘আইডিয়াল’ ভোটের দিনের উদাহরণ তৈরি করেছিল। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল নগণ্য এবং রাজনৈতিক সহিংসতা ছিল চরম। কিন্তু জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম নির্বাচনে চিত্র বদলে যায়। ভোটারের দীর্ঘলাইন এবং প্রবীণদের ভোটাধিকার প্রয়োগ ছিল চোখে পড়ার মতো। তরুণরা প্রথমবারের মতো গণতন্ত্র রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনের দিনটি ছিল মিশ্র অনুভূতির। একদিকে ছিল দ্রুত ভোটদান প্রক্রিয়া, অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণবঙ্গের কিছু এলাকায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো নৈতিকতাবিরোধী ঘটনা ঘটেছিল। তবে মোটের ওপর ভোট ছিল প্রতিযোগিতামূলক। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রথম ব্যবহৃত হয়। এটি ছিল একটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি। কেন্দ্রগুলোতে তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল রেকর্ড সৃষ্টিকারী। দিনটি ছিল সম্পূর্ণ কোলাহলমুক্ত ও সুশৃঙ্খল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের দিনটি ছিল বিষণ্ণ। অধিকাংশ আসনেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় ভোটের দিন ভোটারের লাইন ছিল অদৃশ্য। নেতিবাচক পয়েন্ট হিসেবে ‘ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ’ এবং ‘সহিংসতা’ এই দিনটিকে কলঙ্কিত করেছিল।
২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটলেও ভোটের দিনের স্বচ্ছতা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে। ‘রাতের ভোট’ নামক একটি মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সরকারিভাবে দ্রুত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু নৈতিকতার নিরিখে দিনটি তর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার দেখা যায়। অ্যাপের মাধ্যমে ভোটাররা তাদের কেন্দ্র খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু প্রধানবিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের ঘাটতি ছিল।এই নির্বাচন অনেকের কাছে আমি আর ডামি ভোট হিসেবে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারিতে সহিংসতা কম হলেও ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ ছিল প্রবল।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, এদেশের ১৮ কোটি মানুষের একটাই কৌতূহলী প্রশ্ন, কেমন হবে এবারের নির্বাচনের দিনটি? এজন্য নিবন্ধের এ পর্যায়ে আমি আলোকপাত করব বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয় কেমন হওয়া চাই ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি? ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আমরা এমন একটি দিন চাই, যা হবে গত ৫৩ বছরের অভিজ্ঞতার নির্যাস। যদিও বাংলাদেশে অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। এই দিনটি কেবল ব্যালট পেপারে সিল মারার দিন হবে না, বরং এটি হতে হবে একটি জাতির ‘জাতীয় শুদ্ধি অভিযান’। ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি ভোটকেন্দ্রে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত ভোটার শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। এই নির্বাচনে জাল ভোট প্রদান অসম্ভব করে তোলা হতে পারে। ভোটদান প্রক্রিয়া হবে কাগজের ব্যালট ও প্রযুক্তির এমন এক সংমিশ্রণ, যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তার সময় বলে দিবে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ মনে করে সেদিন ভোরে মানুষ ঘুম থেকে উঠবে কোনো রাজনৈতিক ভীতি নিয়ে নয়, বরং একটি জাতীয় উৎসবে যোগ দেওয়ার আনন্দ নিয়ে। পাড়ায় পাড়ায় থাকবে সৌহার্দ্যরে পরিবেশ।
নির্বাচন কমিশন হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনের ব্যতিক্রমে দিক হলো কেন্দ্রগুলোতে প্রতিবন্ধীদের জন্য থাকবে বিশেষ র্যাম্প এবং স্বেচ্ছাসেবক। নারী ভোটারদের জন্য থাকবে নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ। বাংলাদেশ সরকার হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভোটের কারণে যেন দেশের অর্থনৈতিক চাকা থমকে না যায়। বরং নির্বাচনের দিনটি হবে একটি সুশৃঙ্খল ছুটির দিনের মতো, যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সচল থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, এই দিনে পুলিশ বা বিজিবি থাকবে জনগণের বন্ধু হিসেবে। তাদের উপস্থিতি ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং ভোটারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য হবে। কোনো ‘পেশিশক্তির অপব্যবহার’ সেদিন সহ্য করা হবে না।
দেশবাসী আশা করেন, এই দিন প্রার্থীরা একে অপরের ওপর হামলা না করে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখবেন। হার-জিত যাই হোক, দিন শেষে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দেশাত্মবোধের পরিচয় দেবেন।
তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্র থেকেই সরাসরি ফলাফল আপডেট করা হবে। কোনো গুজব বা অপপ্রচার যাতে ডালপালা মেলতে না পারে, তার জন্য থাকবে ফ্যাক্ট-চেকিং সেল। এই দিবসে বিষয়ে বাংলাদেশের সুনাগরিকরা মনে করেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের প্রতিটি নাগরিক ভোটকেন্দ্রে অবাধে গমন করার সুযোগ থাকা উচিত। তাদের দৃষ্টিতে ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’- এই স্লোগানটি শুধু মুখেই যেন না থাকে, বরং তা হতে হবে বাস্তব।
অতীতের নির্বাচনগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে, শুধু ব্যালট বাক্স ভরালেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না; তার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের জন্য এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা। এই দিনে প্রতিটি নাগরিক যেন গর্বের সঙ্গে বলতে পারে, ‘আমি আমার পছন্দমতো ভোট দিয়েছি।’ রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে একটি সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এই নির্বাচন হতে হবে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং ইতিবাচক ঘটনাগুলোকে পাথেয় করে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। আমরা চাই এমন একটি ভোটের দিন, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের ভোট হবে মূল্যবান, যেখানে পেশিশক্তির চেয়ে জনমতের শক্তি হবে প্রবল। গণতন্ত্র শুধু একটি শাসন পদ্ধতি নয়, এটি একটি জীবনবোধ। ১৯৭১ সালের চেতনা আর ২০২৪ সালের প্রযুক্তিকে মিলিয়ে ২০২৬ সালে আমরা একটি আদর্শ নির্বাচনের উদাহরণ সৃষ্টি করব- এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। জয় হোক গণতন্ত্রের, জয় হোক বাংলাদেশের মানুষের।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
লেখক ও প্রাবন্ধিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল
