নির্বাচনে জনগণের আমেজ
সুমাইয়া জাহান সিনথী
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৭ বছর পর বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে আমেজটা বিরাজ করছে, তা হয়তো এর আগে আর কখনও দেখা যায়নি। দেশের উপর স্তরের জনগণ থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনগণ পর্যন্ত নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছে। জুলাই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে নতুন পুরাতন অনেক রাজনৈতিক দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছে। ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ নির্বাচিত করবে তাদের আগামীর নেতৃত্বকে। গত ১৭ বছরে মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে একটি অনিহা তৈরি হয়েছিল। এর পেছনে মূল কারণ ছিল নির্বাচনে ভোট কারচুপি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে নির্বাচনের দুর্নীতি একটি সাধারণ বিষয়ে হয়ে গিয়েছিল। জাল ভোট প্রদান, ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, টাকার বিনিময়ে ভোট ক্রয়, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অপব্যবহার, ভোট গণনায় কারচুপি, ইত্যাদি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের নির্বাচনের একটি অংশ। নির্বাচন এসব দুর্নীতির কারণে অযোগ্য নেতৃত্ব বারবার ক্ষমতায় এসেছে। এভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর ফলে দেশের জনগণ নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার উপর ভরসা হারিয়ে ফেলেছিল। আর অযোগ্য নেতৃত্ব বারবার ক্ষমতায় আসার ফলে দেশের উন্নয়ন চরমভাবে বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে, যা বহির্বিশ্বের কাছেও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে।
গত ১৭ বছরে জনগণের নির্বাচন নিয়ে অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করলে প্রথমে উঠে আসে- তাদের মধ্যে অনেকেই ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে দেখেছে তাদের ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গিয়েছিল, আবার এটাও শোনা যায় যে অনেকে ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে সেখানে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। এসব দেখে ভোটারদের একটি বড় অংশ ভোট প্রদানে বিমুখী হয়ে পড়েছিল। এমন অনেকে আছে যারা ভোটার হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় নির্বাচনসহ ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও কখনও ভোট দেয়নি। তাদের ধারণা- ভোট দিয়ে কি হবে। দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের একটি ভোট কতটুকু মূল্যবান সে সম্পর্কে তারা সচেতন নয় বা নির্বাচনের পর বারবার একই অযোগ্য ব্যক্তি ক্ষমতায় আসার ফলে তারা নির্বাচনে ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তবে এই জুলাই আন্দোলন ও এর পরবর্তী সময়ে দেশের জনগণ অনেকটাই সচেতন হয়েছে। জনগণ একটু হলেও বুঝতে পেরেছে নির্বাচনে তাদের ভোটের গুরুত্ব। জনগণ এখন চায় এমন এক সরকার, যে সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করবে। সমস্যা সমাধানের জন্য যেন জনগণকে সরকারের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়, সমস্যার সমাধান যেন জনগণের দ্বারে এসে পৌঁছায়।
আজকাল চায়ের দোকানে চায়ের কাপে জমে ওঠে রাজনীতি ও নির্বাচনের গল্প, জনগণের সমস্যার গল্প, অতীতে কোন রাজনৈতিক দল জনকল্যাণে কেমন কাজ করেছিল সেটার গল্প। আজ প্রান্তিক জনগণ পর্যন্ত খোঁজখবর রাখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু, রাকসু, চাকসু, জাকসু) নির্বাচনের।
এবার নির্বাচনে গণভোট নামক আরেকটি ভোটে ভোটাররা অংশগ্রহণ করবেন। যেখানে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার মাধ্যমে জনগণ জুলাই আন্দোলন তথা রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে ভোট দেবেন। যেখানে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। আর না ভোট প্রদানের মাধ্যমে দেশের প্রচলিত শাসন কাঠামোই বহাল থাকবে। তবে প্রচলিত শাসন কাঠামো অনুযায়ী দেশ চললে দেশে আবার কোনো স্বৈরাচারী সরকার আসার সম্ভাবনা থেকেই যায়। জনগণের মাঝে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি দেখা যাচ্ছে, জনগণ চাচ্ছে হ্যাঁ ভোট দিয়ে দেশের প্রচলিত শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন ঘটাতে যেন আগামীতে কোনো স্বৈরাচারী সরকার দেশকে শাসন করতে না পারে। আশা করা যায় জনগণ এবার চতুরতার সঙ্গে আগামী নেতৃত্ব বেছে নিবে। ১২ই ফেব্রুয়ারি এই নির্বাচন যেন হয় দেশের নির্বাচন ইতিহাসের এক মাইলফলক।
সুমাইয়া জাহান সিনথী
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
