প্রত্যাশা ও প্রত্যয়ের নির্বাচন নবদিগন্তের পথে বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বহুল প্রতীক্ষিত গণভোট। দীর্ঘ সময়ের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা, রাজনৈতিক সমীকরণ আর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার এক মহাসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ ১২ কোটি ৭৭ লাখেরও বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ২৯৯টি আসনে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মযজ্ঞ শুধু প্রতিনিধি নির্বাচনের লড়াই নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সুসংহত করার এক বিশাল পরীক্ষা।

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো- এর বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং নিরাপত্তার নিশ্চিদ্র চাদর। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তার খাতিরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রায় ৯ লাখ সদস্যের বিশাল বাহিনীর পাশাপাশি ১ লাখেরও বেশি সেনাসদস্যের উপস্থিতি সাধারণ ভোটারের মনে সাহসের সঞ্চার করছে। বিশেষ করে ড্রোন, ইউএভি এবং বডি ওর্ন ক্যামেরার মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এটাই প্রমাণ করে যে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্র কোনো প্রকার ছাড় দিতে রাজি নয়।

তবে অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা প্রস্তুতির চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোটারদের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে, সেই আশাবাদ- জনগণ দীর্ঘকাল পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যারা আগামীর বাংলাদেশের কারিগর, তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই হবে, এই নির্বাচনের সার্থকতা। গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি উৎসব, একটি সামাজিক অঙ্গীকার। ৫৪ হাজারের বেশি দেশি পর্যবেক্ষক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ৫৪০ জন বিদেশি প্রতিনিধি ও সাংবাদিকের উপস্থিতি প্রমাণ করে, বিশ্ববাসীর নজর আজ ঢাকার দিকে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবারের লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করছে ৫০টি রাজনৈতিক দল। ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে বড় দলগুলোর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আধিক্য রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের ইঙ্গিত দেয়। যদিও একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোট স্থগিত হয়েছে এবং কিছু দল অংশগ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে, তবুও ২৯৯ আসনে ১২ কোটির বেশি মানুষের অংশগ্রহণ এই নির্বাচনকে একটি জাতীয় উৎসবে রূপান্তর করেছে। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে পোস্টাল ব্যালট এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসী ও অভ্যন্তরীণ ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকেই ধারণ করে।

আমাদের প্রত্যাশা- শুধু উচ্চ নিরাপত্তা আর প্রযুক্তির মেলা নয়, বরং একটি প্রকৃত অর্থেই ‘ভয়ভীতিহীন’ পরিবেশ বজায় থাকুক। ভোটাররা যেন নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে পারেন এবং তাদের পছন্দের প্রার্থীকে জয়যুক্ত করে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার আড়ালে উৎসবের আমেজ ম্লান হতে দেখা গেছে, কিন্তু এবার ইসির আশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি সেই শঙ্কা দূর করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

গণতন্ত্রে মতভিন্নতা থাকবেই, কিন্তু ব্যালটের মাধ্যমে সেই ভিন্নতার সমাধানই হলো সভ্য সমাজের পরিচয়। আজ সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে যে জনস্রোত নামবে, তা যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে জিম্মি না হয়। প্রিজাইডিং অফিসার থেকে শুরু করে পোলিং অফিসার পর্যন্ত যে ৮ লাখ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বই হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মূলশক্তি।

পরিশেষে, ভোটারদের প্রতি আমাদের আহ্বান- আপনার একটি ভোট আগামী ৫ বছরের জন্য দেশের গতিপথ নির্ধারণ করবে। এটি আপনার নাগরিক অধিকার এবং নৈতিক দায়িত্ব।

আসুন, সকল শঙ্কা দূরে সরিয়ে আমরা গণতান্ত্রিক এই উৎসবে শামিল হই। আজ বিকেল সাড়ে ৪টায় যখন ভোটগ্রহণ শেষ হবে, তখন যেন কোনো পেশিশক্তি বা কারচুপির কালিমা আমাদের ললাটে না জোটে। জয় হোক গণতন্ত্রের, জয় হোক সাধারণ মানুষের ইচ্ছার।