শেয়ারবাজারে স্থবিরতা, সুখকর নাকি দায়বদ্ধতা

মুহিবুল হাসান রাফি

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরানো বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি শে দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু ঘোষণার নয় মাস পার হলেও বাস্তব চিত্র হতাশাজনক-একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানও বাজারে আসেনি। বরং আবারও প্রমাণিত হলো, নীতিগত সদিচ্ছা থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সংস্কারের পথে প্রধান বাধা।

গত বছরের ১১ মে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শেয়ারবাজারকে গতিশীল করতে যে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা ছিল সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়, বহুজাতিক কোম্পানির অংশীদারত্ব উন্মুক্ত করা, ভালো দেশীয় কোম্পানিকে বাজারে আনতে প্রণোদনা, বিদেশি বিশেষজ্ঞ যুক্ত করা এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংকনির্ভরতা কমানো- এই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়িত হলে শেয়ারবাজারে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারত। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কোনোটিই পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য বলছে, সর্বশেষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ২০১২ সালে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। এরপর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাজারে আসেনি।

উল্টো এই সময়ে দুর্বল ও কম পারফরম্যান্স করা কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এমন বাস্তবতায় ভালো রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি শুধু প্রয়োজনই নয়,বরং জরুরি ছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা গেলেও তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর টেবিলেই আটকে আছে- এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত করেছে, আইপিও বিধিমালাও সংশোধন করেছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা যেসব মন্ত্রণালয়ের হাতে, সেখানেই অনীহা ও গড়িমসি স্পষ্ট। ফলে আবারও প্রশ্ন উঠছে- শেয়ারবাজার সংস্কার কি শুধু নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

দেশীয় ভালো কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে কর বা নীতিগত প্রণোদনার অভাবও একটি বড় বাধা। শুধুমাত্র বিধিমালা সংশোধন করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয় না; প্রয়োজন সুস্পষ্ট আর্থিক সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা। একইভাবে বাজার সংস্কারে বিদেশি বিশেষজ্ঞ যুক্ত করার সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত নামমাত্র বাস্তবায়নে সীমিত থেকেছে।

বড় ঋণগ্রহীতাদের শেয়ার ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি নগণ্য। যদিও বন্ড বাজার উন্নয়নে কিছু নির্দেশিকা প্রণয়ন হয়েছে, তবে কার্যকর প্রয়োগ ও বাজারে আস্থা তৈরির উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়। ইতিবাচক দিক একটাই- কারসাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছুটা সক্রিয়তা।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টাই ছিল শেয়ারবাজারে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের সবচেয়ে উপযুক্ত সুযোগ।

রাজনৈতিক চাপমুক্ত এই সময়ে চার-পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা গেলে বাজারে একটি শক্ত বার্তা যেত। কিন্তু সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। যৌথ কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়েও যদি সিদ্ধান্তের অগ্রগতি না হয়, তবে তা শুধু বিনিয়োগকারীদের হতাশাই বাড়াবে।

শেয়ারবাজার অর্থনীতির দর্পণ। সেখানে স্থবিরতা মানে বৃহত্তর অর্থনীতির জন্যও অশনিসংকেত। এখনই লাল ফিতার জট ছিঁড়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে, ভবিষ্যতে এই ব্যর্থতার মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকেই।

মুহিবুল হাসান রাফি

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ