উৎসবের আবহে সম্পন্ন হলো ভোট

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট- উভয়ই নাগরিক অধিকারের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। যখন এই দুই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কোনো একটি উৎসবের আবহে অনুষ্ঠিত হয়, তখন তা শুধু ভোটের লড়াই থাকে না, বরং রূপান্তরিত হয় একটি জাতীয় মেলবন্ধনে। উৎসবের আনন্দ আর রাজনীতির গুরুত্ব যখন এক মোহনায় এসে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্দীপনা দেখা যায়, তা আধুনিক গণতন্ত্রের এক অনন্য বিজ্ঞাপন।

সংসদ নির্বাচন হলো প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, যা পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করে। অন্যদিকে, গণভোট সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় ইস্যুতে জনগণের মতামত গ্রহণের এক অনন্য হাতিয়ার। যখন একটি দেশ বড় কোনো সংস্কার বা সংবিধান সংশোধনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন গণভোটের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এবারের উৎসবমুখর পরিবেশে এই দুই মাহেন্দ্রক্ষণ একসঙ্গে আসা নাগরিক জীবনের জন্য এক বিরল অভিজ্ঞতা।

সাধারণত নির্বাচন মানেই এক ধরনের থমথমে উত্তেজনা, কড়া নিরাপত্তা আর রাজনৈতিক বাগবিতণ্ডা। কিন্তু যখন এই প্রক্রিয়ার সাথে ‘উৎসবের আবহ’ যুক্ত হয়, তখন ঘৃণা ও সংঘাতের জায়গা দখল করে নেয় ভ্রাতৃত্ব। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবখানেই থাকে উৎসবের আমেজ। রঙিন পোস্টার, তোরণ আর নির্বাচনী প্রচারণার গানগুলো যেন কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। এই আবহে ভোটারদের মধ্যে ভয়ভীতির বদলে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়, যা একটি সচল গণতন্ত্রের লক্ষণ।

সংসদ নির্বাচনে আমরা প্রতিনিধি বাছাই করি, কিন্তু অনেক সময় বড় বড় জাতীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সেই প্রতিনিধিদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা সম্ভব হয় না। এখানেই গণভোটের মহিমা। এটি জনগণকে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলার সুযোগ দেয়। উৎসবের মৌসুমে যখন মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত থাকে, তখন তারা অত্যন্ত উদার ও সুস্থ মনে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা মানে শুধু নাগরিক দায়িত্ব পালন নয়, বরং রাষ্ট্রের মালিকানার অংশীদার হওয়া।

তবে উৎসবের এই জোয়ারে যেন মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে না যায়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। উৎসবের আড়ালে কালো টাকার প্রভাব, পেশিশক্তির ব্যবহার কিংবা আবেগপ্রসূত ভুল সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। সম্পাদকীয় দৃষ্টিতে বলা যায়- উৎসবের আমেজ যেন নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা থেকে বিচ্যুত না করে। প্রতিটি ভোট যেন হয় সচেতন ও স্বাধীন। রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই রক্তপাতে পর্যবসিত না হয়।

বর্তমান যুগে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা সবচাইতে বেশি। উৎসবপ্রিয় এই তরুণ প্রজন্মকে ভোটমুখী করতে উৎসবের আবহ বড় ভূমিকা রাখে। প্রযুক্তির কল্যাণে আজ নির্বাচনি ইশতেহার হাতের মুঠোয়। গণভোটের মতো জটিল বিষয়গুলো এখন সামাজিকমাধ্যমে সহজবোধ্যভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ অনেক বেশি সচেতন হয়ে তাদের রায় প্রদান করছে।

সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট- উভয়ই রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর মজবুত করার উপাদান। উৎসবের আবহে এই প্রক্রিয়ার উদযাপন প্রমাণ করে যে, রাজনীতি শুধু ক্ষমতাদখলের লড়াই নয়, এটি জনগণের অধিকারের স্বীকৃতি। আমরা আশা করি, এই উৎসবমুখর নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিনিধিরা উঠে আসবেন এবং গণভোটের রায়ে দেশ সঠিক সংস্কারের পথে এগোবে। গণতন্ত্রের এই মহোৎসবে জয় হোক সাধারণ মানুষের, জয় হোক যুক্তিবাদী চেতনার।