কোচিংয়ের জাঁতাকলে শ্রেণিকক্ষের পতন ও নৈতিক স্খলন

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হলেও, বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সেই মেরুদণ্ডেই বাসা বেঁধেছে এক মারাত্মক ব্যাধি- কোচিং বাণিজ্য ও বেসরকারি টিউশনের লাগামহীন বিস্তার। একসময় দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তার কেন্দ্র হিসেবে শুরু হলেও, বর্তমানে এটি একটি বিশাল আকার ধারণ করা লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এই রমরমা ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হলো অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মনে থাকা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক চাপ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত শিক্ষার অভাব। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন না হওয়ায়, শিক্ষকের ব্যক্তিগত মনোযোগের অভাব এবং সিলেবাস দ্রুত শেষ করার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই কোচিং সেন্টারগুলো এখন সকাল-সন্ধ্যা ধরে নানা ব্যাচে বিভক্ত করে বাণিজ্য চালাচ্ছে, যেখানে শিক্ষাগ্রহণ গৌণ এবং গাইডলাইন মুখস্থ করানোই মুখ্য। এই বাণিজ্যিকীকরণের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো শিক্ষকদের নীতিগত স্খলন। অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে কম পড়িয়ে বা গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজ কোচিং সেন্টারে বা ব্যক্তিগত টিউশনে আসার জন্য উৎসাহিত করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় কোচিং করানো নিষিদ্ধ হলেও, শিক্ষকরা নানা কৌশলে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা শিক্ষকের পেশাগত সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। দ্বিতীয়ত, এই কোচিং নির্ভরতা শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক সৃজনশীলতা ও মেধার বিকাশকে রুদ্ধ করে। কোচিং সেন্টারে সাধারণত অল্প সময়ে প্রচুর তথ্য মুখস্থ করানোর উপর জোর দেওয়া হয়, ফলে শিক্ষার্থীরা চিন্তাভাবনা করা বা গভীর বিশ্লেষণ করার সুযোগ পায় না। তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া, জ্ঞানার্জন নয়। এটি শিক্ষার্থীদেরকে বইয়ের সীমিত জগতের বাইরে কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে নিরুৎসাহিত করে এবং তারা একটি বাঁধাধরা ছকের মধ্যে বেড়ে ওঠে। তৃতীয়ত, এটি আর্থিক বৈষম্যকে প্রকট করে তোলে। উচ্চ ফি’র কারণে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা বা বাড়তি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়, কারণ সামর্থ্য না থাকায় তারা নামিদামি কোচিং সেন্টারগুলোতে ভর্তি হতে পারে না।

এর ফলে সমাজের দুর্বল অর্থনৈতিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে এবং বৈষম্যের শিকার হয়। চতুর্থত, এই কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে দুর্বল করে। কোচিংয়ের চাপে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে, ক্লাসের কাজে মনোযোগ দেয় না এবং শিক্ষকদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা কমে যায়। তাদের মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে স্কুলের শিক্ষকের চেয়ে কোচিংয়ের শিক্ষকই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যা স্কুলের পরিবেশ ও শৃঙ্খলা নষ্ট করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্কুলের বাইরে একাধিক বিষয়ে টিউশন করতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থী দিনে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা পড়ালেখার মধ্যে থাকছে, যা তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অতিরিক্ত চাপের কারণে শিশুরা খেলাধুলা, শিল্পচর্চা বা অন্যান্য সামাজিক কার্যকলাপ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যার ফলে তারা একঘেয়েমি, বিষণ্ণতা এবং মানসিক উদ্বেগে ভুগছে। এই পরিস্থিতির প্রতিকারের জন্য প্রথমত, সরকারকে শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত ও পর্যাপ্ত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত বেতন ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করে তাদের নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে যে, শুধুমাত্র নম্বর বা জিপিএ-৫-এর পেছনে না ছুটে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশ ও প্রকৃত জ্ঞানার্জনের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। এই কোচিং চক্র ভাঙতে হলে শ্রেণিকক্ষের গুণগত মান উন্নয়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপনই একমাত্র সমাধান। অন্যথায়, কোচিং বাণিজ্য শুধু রমরমা ব্যবসা হিসেবেই টিকে থাকবে, যার ফলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার শিকার হবে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়