নেশাগ্রস্ত তরুণ নয় নেশাগ্রস্ত ব্যবস্থা
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদক সেবন কোনো নতুন ঘটনা নয়, কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধও নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহ্য করা বাস্তবতা। ক্যাম্পাসের ভেতরেই রয়েছে পরিচিত জায়গা- যেগুলো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসন সবারই জানা। কোথাও সন্ধ্যার পর ধোঁয়া ওঠে, কোথাও রাতে আড্ডার আড়ালে চলে নেশা। এই জায়গাগুলো হঠাৎ তৈরি হয়নি, এগুলো টিকে আছে দীর্ঘদিনের নীরবতা, অবহেলা আর সুবিধাবাদী চোখ বন্ধ করে রাখার সংস্কৃতির কারণে।
আমরা প্রায় বলি তরুণরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো?- যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞান, যুক্তি আর নেতৃত্ব তৈরির কথা, সেখানে যদি বছরের পর বছর ধরে নির্দিষ্ট মাদক স্পট গড়ে ওঠে, তবে দায় কার? একজন শিক্ষার্থী একা এই পরিবেশ তৈরি করতে পারে না। এটা সম্ভব হয় তখনই, যখন প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল, শৃঙ্খলা কাগজে বদ্ধ তখন দায় এড়ানো নীতি হয়ে দাঁড়ায়।
বিভিন্ন গবেষণা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, দেশে মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশ তরুণ এবং শিক্ষার্থী। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল থেকে শুরু করে সিনথেটিক ড্রাগ- সবই সহজলভ্য। এই সহজলভ্যতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকা, মেস, হলের আশপাশ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হলের ভেতর- এসব জায়গা মাদকের নিরাপদ করিডোরে পরিণত হয়েছে। তবু প্রশ্ন উঠলে বলা হয়- ‘প্রমাণ নেই’, ‘সবাই তো করে না’।
এই ‘সবাই তো করে না’ যুক্তিটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এতে সমস্যাকে ব্যক্তিগত ব্যতিক্রম হিসেবে দেখানো হয়, কাঠামোগত ব্যর্থতাকে আড়াল করা হয়। বাস্তবতা হলো- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষাজীবনে একাধিকবার সরাসরি মাদক সেবনের দৃশ্য দেখে। কেউ প্রতিবাদ করে না, কেউ রিপোর্ট করে না। কারণ সবাই জানে- বললে ঝামেলা বাড়বে, সমাধান হবে না।
আর কনসার্ট? বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত অনুষ্ঠান এটি কিন্তু এগুলো আজকাল শুধু গান আর উচ্ছ্বাসের জায়গা নয়, অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছে প্রকাশ্য মাদক সেবনের উৎসব। আলো-শব্দণ্ডভিড়ের আড়ালে মাদক সেবন এখন আর গোপন কিছু নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি ইভেন্ট কালচার-এর অংশ হিসেবেই দেখা হয়। আয়োজকরা জানে, দর্শক জানে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অনেক সময় জানে- তবু চোখ বন্ধ থাকে।
কেন?
কারণ এখানে অর্থ আছে, স্পনসর আছে, জনপ্রিয়তার গল্প আছে। মাদক প্রশ্নে নৈতিকতা তখন ঝামেলার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে রাষ্ট্র মাদকবিরোধী অভিযান চালায়, অন্যদিকে বড় কনসার্ট ও ক্যাম্পাস কালচারে মাদক সেবন কার্যত অঘোষিত ছাড় পেয়ে যায়। এই দ্বিচারিতাই তরুণদের সবচেয়ে বড় বার্তা দেয়- নেশা আসলে নিষিদ্ধ নয়, শুধু দুর্বলদের জন্য শাস্তিযোগ্য।
আমরা যাদের গ্রেপ্তার করি, তারা মূলত ব্যবহারকারী। অথচ সরবরাহব্যবস্থা, ক্যাম্পাসে প্রবেশপথ, বড় ইভেন্টে নিয়ন্ত্রণহীনতা- এসব প্রশ্ন কখনোই গুরুত্ব পায় না। ফলে তরুণের কাছে বার্তাটা পরিষ্কার- তুমি ধরা পড়লে অপরাধী, কিন্তু এই পরিবেশ তৈরির দায় কারও নয়।
আরেকটি বড় সত্য হলো- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের মানসিক চাপে থাকে। সেশনজট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আবাসন সংকট, অনিশ্চিত চাকরির বাজার- সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় স্থায়ী হয়ে ওঠে। এই চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ ক্যাম্পাসে মানসিক স্বাস্থ্য এখনও বিলাসিতা, প্রয়োজন নয়।
এই শূন্যতার জায়গাতেই মাদক ঢুকে পড়ে। প্রথমে কৌতূহল, তারপর বন্ধুবান্ধবের চাপ, পরে অভ্যাস। এই প্রক্রিয়াটা ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটি একটি প্যাটার্ন। কিন্তু আমরা সেই প্যাটার্ন ভাঙার বদলে ব্যক্তিকে অপরাধী বানাই। শাস্তি দিই, লেবেল লাগাই, সমাজ থেকে আলাদা করে দিই। পুনর্বাসন, চিকিৎসা, সামাজিক পুনঃস্থাপনের কথা খুব কমই বলা হয়।
আইন অনুযায়ী মাদক অপরাধ- এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আসক্তিকে আমরা অপরাধ হিসেবে দেখব, না রোগ হিসেবে? যখন একজন শিক্ষার্থী মাদকাসক্ত হয়, তখন তার পড়াশোনা থেমে যায়, পরিবার ভেঙে পড়ে, ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে আসে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কি শুধু শাস্তি দেওয়া? নাকি তাকে ফেরানোর দায়িত্বও রাষ্ট্রের?
বাস্তবতা হলো- পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা সীমিত, মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোনো কার্যকর পুনর্বাসন কাঠামো নেই। ফলে একজন শিক্ষার্থী ধরা পড়লে তার সামনে দুটি পথ খোলা থাকে- আইনি ঝামেলা বা সামাজিক লজ্জা। ফিরে দাঁড়ানোর সুযোগ খুব কম।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- মাদক এখন অনেক ক্ষেত্রে গ্ল্যামারাইজড। কনসার্ট, নাইটলাইফ, মডার্ন কালচার- এর সঙ্গে নেশাকে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের কাছে এটি বিদ্রোহ বা আধুনিকতার প্রতীক হয়ে উঠছে। রাষ্ট্র ও সমাজ এই বার্তাকে শক্তভাবে চ্যালেঞ্জ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ সেখানে দায় নিতে হয়, জনপ্রিয়তার বিপক্ষে দাঁড়াতে হয়।
তরুণ প্রজন্মের মাদক গ্রহণ আসলে একটি জাতীয় সতর্ক সংকেত। এটি বলছে- আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দিকনির্দেশনা দিতে পারছে না, আমাদের কর্মসংস্থান কাঠামো আশার জায়গা তৈরি করতে পারছে না, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিসর বিকল্প বিনোদন দিতে পারছে না। এই ব্যর্থতার জায়গাতেই নেশা জায়গা করে নেয়। সমাধান যদি সত্যিই চাই, তাহলে অভিযান দিয়ে শুরু করলে হবে না। শুরু করতে হবে দায় স্বীকার দিয়ে।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
শিক্ষার্থী : গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
