গণভোটে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হলো জনগণ। আর এই জনমতের সরাসরি বহিঃপ্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো গণভোট বা রেফারেন্ডাম। যখন কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণ নির্বাচন বা সংসদীয় বিতর্ক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্র সরাসরি জনগণের দ্বারস্থ হয়। ‘গণভোটে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন’ শিরোনামটি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কথা বলে না, বরং এটি নাগরিকের মর্যাদাবোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থার এক অনন্য দলিল।
গণতন্ত্র মানেই জনগণের শাসন। তবে পরোক্ষ গণতন্ত্রে বা সংসদীয় ব্যবস্থায় অনেক সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মৌলিক আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে চলে যায়। এই ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়ার নামই গণভোট। যখন একটি দেশ কোনো বড় ধরনের শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন, নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তখন সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট নয়। সেখানে প্রয়োজন জনগণের প্রত্যক্ষ ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।
গণভোটের মাধ্যমে জনগণ কেবল ভোটার হিসেবে নয়, বরং নীতিনির্ধারক হিসেবে অবতীর্ণ হয়। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহার নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জাতীয় ইস্যু প্রধান হয়ে ওঠে। ফলে জনআকাঙ্ক্ষা সরাসরি রাষ্ট্রীয় দলিলে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ পায়।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, ক্ষমতার রাজনীতিতে জনআকাঙ্ক্ষা গৌণ হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান সংশোধন বা আইন পরিবর্তন করে। এমন পরিস্থিতিতে গণভোট একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। গণভোটে লুকোচুরির সুযোগ কম থাকে। জনগণ সরাসরি একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের ওপর তাদের রায় দেয়। সংসদ কোনো আইন পাস করলে তাতে বিরোধী পক্ষের আপত্তি থাকতে পারে, কিন্তু গণভোটে প্রাপ্ত রায়কে অগ্রাহ্য করার নৈতিক শক্তি কারও থাকে না। এটি নাগরিককে অনুভব করায় যে রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণে তার একটি ভোটের সরাসরি প্রভাব রয়েছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের অনেক দেশ জটিল রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পেয়েছে গণভোটের মাধ্যমে। যুক্তরাজ্যের ‘ব্রেক্সিট’ ইস্যু হোক কিংবা চিলির নতুন সংবিধান প্রণয়নের লড়াই, সবক্ষেত্রেই গণভোট ছিল জনগণের ক্ষোভ বা আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত প্রতিফলন। যদিও ব্রেক্সিটের মতো কিছু ক্ষেত্রে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু পদ্ধতি হিসেবে এটি যে জনগণের ইচ্ছা প্রকাশের সর্বোচ্চ মাধ্যম, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গণভোটের গুরুত্ব অপরিসীম। সংবিধানের অনেক মৌলিক বিষয় বা রাষ্ট্রের চারিত্রিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান এক সময় কার্যকর ছিল। জনআকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হলে এমন কিছু স্থায়ী ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন যাতে শাসকরা চাইলেই জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বড় কোনো পরিবর্তন চাপিয়ে দিতে না পারে।
গণভোট মানেই যে সবসময় নির্ভুল সমাধান, তা নয়। এর কিছু পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে- যদি জনগণকে সঠিক তথ্য না দিয়ে আবেগতাড়িত করা হয়, তবে গণভোট ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে। সংখ্যাগুরুরা অনেক সময় আবেগের বশবর্তী হয়ে সংখ্যালঘুর স্বার্থবিরোধী রায় দিতে পারে। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী অনেক সময় গণভোটকে তাদের শাসনের বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, যা প্রকৃত জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় না। তাই একটি সফল গণভোটের পূর্বশর্ত হলো- মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং নাগরিকের অবাধ মত প্রকাশের সুযোগ। জনআকাঙ্ক্ষা কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে সেই পরিবর্তনের পালস বা স্পন্দন বুঝতে হয়। গণভোট হলো সেই যন্ত্র যা জনগণের হৃদস্পন্দন পরিমাপ করে। যখন কোনো জাতি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে বা নতুন কোনো ভোরের স্বপ্ন দেখে, তখন জনগণের রায় নেওয়াই সবচেয়ে সম্মানজনক পথ।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যারা থাকেন, তাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, ব্যালট পেপার কেবল প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য নয়, বরং জনমতের সঠিক মূল্যায়নের জন্যও। ‘গণভোটে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন’ তখনই সার্থক হবে যখন প্রতিটি নাগরিক অনুভব করবেন যে, তার দেশ তার ইচ্ছা অনুযায়ী চলছে। একটি জবাবদিহিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠনে গণভোটের বিকল্প নেই। জনগণের কণ্ঠস্বরই হোক রাষ্ট্রের প্রধান চালিকাশক্তি।
