সন্ত্রাসবাদ-সহিংসতা দমনে নতুন সরকারের দায়বদ্ধতা
আব্দুল কাদের জীবন
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, চড়াই-উতরাই এবং কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ অবশেষে প্রবেশ করেছে এক নতুন অধ্যায়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে- এটিই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় স্বস্তি। জনরায়ের প্রতিফলনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের পর জিয়া পরিবারের উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার নতুন পথচলা শুরু হতে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সুশীল সমাজের মতে, নির্বাচনটি অতীতের তুলনায় অনেকটা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে, যা হাজারো ব্যর্থতার মাঝে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি বড় সাফল্য হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে। কিন্তু গণতন্ত্রের এই সুপ্রভাতে কালো মেঘ হয়ে দেখা দিয়েছে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা। জয়ের আনন্দ যখন বিষাদে রূপ নেয়, তখন সেই গণতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। নতুন সরকারের সামনে এখন প্রথম এবং প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—সন্ত্রাসবাদ ও প্রতিহিংসার রাজনীতিকে সমূলে উৎপাটন করা।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে খবরগুলো আসছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিরোধী মতের ওপর নির্যাতন, দোকানপাট পুড়িয়ে দেওয়া, ভাঙচুর এবং গুরুতর আহতের ঘটনা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কখনও কাম্য হতে পারে না। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯টি আসনে নির্বাচনি সহিংসতায় ১৪৪ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, কোথাও কোথাও হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। যদিও এই হত্যাকাণ্ডগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নাকি ব্যক্তিগত বিরোধের জের, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে, তবুও মানুষের প্রাণের হানি ঘটা রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
বিস্ময়কর ও পীড়াদায়ক বিষয় হলো, সংঘাত শুধু ভিন্ন দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অনেক জায়গায় বিএনপির মূল প্রার্থীর সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। আবার আটটি স্থানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। তিনটি স্থানে জামায়াত ও এনসিপি সমর্থকদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে বিজয়ীদের বিরুদ্ধে। এই বিশৃঙ্খল পরিবেশ প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হয়ে গেছে, যা নতুন সরকারের ভাবমূর্তিকে শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, জনগণ তাদের ভোট দিয়েছে শাসনের জন্য নয়, বরং সেবার জন্য। সন্ত্রাসবাদ ও সংঘাত দমনে সরকারকে এখনই কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে-
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা : পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। অপরাধীর পরিচয় যাই হোক- সে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী হোক বা অন্য কেউ- আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, এটি প্রমাণ করতে হবে।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা : প্রতিটি সংসদীয় আসনের নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকায় শান্তি বজায় রাখার জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকতে হবে। যদি কোনো এমপির অনুসারীরা সহিংসতায় লিপ্ত হয়, তবে সেই নেতার বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল : নির্বাচন-পরবর্তী যে ধর্ষণ, লুটপাট ও হত্যার ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোর বিচারের জন্য বিশেষ সেল গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ থামাতে।
গণতন্ত্রের যাত্রাপথ ও ভিন্নমতের গুরুত্ব : গণতন্ত্র মানে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের জয় নয়, বরং সংখ্যালঘিষ্ঠের মতের সম্মান রক্ষা করা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে, তা যেন প্রতিহিংসার আগুনে ছাই না হয়ে যায়। বিরোধীদল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ধ্বংসাত্মক রাজনীতি বর্জন করে সরকারকে গঠনমূলক সমালোচনা ও ভালো কাজে সহযোগিতা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। একটি শক্তিশালী বিরোধীদলই সরকারকে একনায়কতন্ত্রের দিকে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা : অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, গণমাধ্যম যখনই সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করেছে, তখনই দেশ পথ হারিয়েছে। গণমাধ্যমের কাজ শাসকগোষ্ঠীর বন্দনা করা নয়, বরং সমাজের গভীর ক্ষত ও প্রশাসনের ভুলগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। বর্তমানে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে গণমাধ্যমের পরস্পরবিরোধী তথ্য মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। মিডিয়াকে হতে হবে নিরপেক্ষ ও তথ্যনির্ভর। সত্য উদ্ঘাটন করে সরকারকে সঠিক পথে রাখতে সংবাদকর্মীদের সাহসী ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, তার পেছনে রয়েছে ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষের হাজারো ত্যাগ। এই ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা নতুন সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন আসন্ন শক্তিশালী মন্ত্রিসভাকে মনে রাখতে হবে- মানুষ ভয়ের শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছে। তাই জনগণের শাসক না হয়ে, ভয়ের কারণ না হয়ে, তাদের সেবক হতে হবে।
সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ যদি এখনই দমন করা না হয়, তবে জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং সাধারণ মানুষ আবারও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা এবং শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, নতুন সরকার কঠোর হাতে সন্ত্রাস দমন করে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র উপহার দেবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে নির্ভয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।
আব্দুল কাদের জীবন
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
