অস্তিত্ব সংকটে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ

লাবনী আক্তার শিমলা

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অতন্দ্র প্রহরী সুন্দরবন। ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল বনভূমি শুধু পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনই নয়, বরং বাংলাদেশের অস্তিত্বের রক্ষাকবচ। সিডর, আইলা, আম্পান বা রিমালের মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়গুলো যখন বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে, তখন এই বনই নিজের বুক পেতে রক্ষা করে কোটি মানুষের প্রাণ ও সম্পদ। সুন্দরবন শুধু এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে না, একইসঙ্গে এটি দেশের বনজ সম্পদের আধার, জীববৈচিত্র্যের ধারক এবং শত শত মানুষের জীবিকার ঢাল। বাস্তুসংস্থানে সমৃদ্ধ সুন্দরবন বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বিস্তৃত। এর মোট আয়তনের প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে অবস্থিত এবং এটি দেশের মোট বনভূমির প্রায় ৪০ শতাংশ। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে রয়েছে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ৫০৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া ইত্যাদি এবং প্রাণীর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, রেসাস ম্যাকাক, মেছো বিড়াল ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে ৩১৫ প্রজাতির পাখি।

এই অরণ্য থেকে এরইমধ্যে চিরতরে হারিয়ে গেছে বন্য মহিষ, জলার হরিণ, কৃষ্ণসার মৃগ এবং পাহাড়ি ও একশৃঙ্গ গণ্ডারের মতো রাজকীয় সব প্রাণী। বর্তমানে সুন্দরবনের গর্ব রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও বিলুপ্তির চরম ঝুকিতে রয়েছে নোনা পানির কুমির, গঙ্গা ও ইরাবতী ডলফিন এবং বিশ্বের অন্যতম বিরল কচ্ছপ ‘বাটাগুর বাসকা’। এছাড়া মাস্কড ফিনফুটসহ বেশ কিছু প্রজাতির পাখি এখন কালেভদ্রে দেখা যায়। এই প্রাণীদের বিলুপ্তি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান কতটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জানা যায়, বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে খাদ্যশৃঙ্খল বেঁচে থাকে এবং বাস্তুতন্ত্র স্বাভাবিক থাকে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের গত ৫০ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুন্দরবন না থাকলে বাংলাদেশের উপকূলীয় মানচিত্র আজ বদলে যেত। সুন্দরবনের ঘন ম্যানগ্রোভ গাছপালা ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগকে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। বনের শ্বাসমূল ও ঘন বনজঙ্গল জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা কয়েক ফুট নামিয়ে দেয়, যা লোকালয়ে পানির আঘাতকে সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসে। গবেষকদের মতে, একটি বড় ঘূর্ণিঝড় যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, তার মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের আইলার সময় সুন্দরবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ না করলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি হতো।

সুন্দরবন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৫-৪০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করে। বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের একটি বড় অংশ সুন্দরবনের নদ-নদীতে বড় হয়। এখানে প্রায় ২০ প্রজাতির চিংড়ি ও ২১০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে প্রতিবছর গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ টন মধু এবং ৫০ থেকে ৬০ টন মোম সংগ্রহ করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সুন্দরবন একটি বিশাল ‘কার্বন সিঙ্ক’ হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, সুন্দরবন প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। অর্থাৎ, নীরবে এই বন আমাদের প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে। সুন্দরবনের উপকারের তালিকা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। অথচ এত উপকারের বিনিময়ে আমরা তাকে কিছুই দিতে পারিনি, বরং তার ক্ষতি করে যাচ্ছি। তাই সুন্দরবন আজ জর্জরিত বহুমুখী সংকটে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এর প্রভাবে বনের পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে সুন্দরী গাছে ‘আগামরা’ রোগ দেখা দিচ্ছে, যা তার বৃদ্ধি ব্যাহত করছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। এতে বাঘ ও হরিণের চারণভূমি সংকুচিত হচ্ছে। সুন্দরবনে বাড়ছে কর্মসংস্থানের অভাবে সৃষ্ট অতিরিক্ত নির্ভরতার চাপ। মাছ ধরা, মধু সংগ্রহ, গোলপাতা ও কাঠ কাটার ফলে বনের প্রাকৃতিক সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এছাড়া চোরাশিকার, লুটপাট, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। সুন্দরবনে কমছে মিঠাপানির প্রবাহ। উজানে ফারাক্কা বাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে নদ-নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা ও শাখা নদীগুলো থেকে পর্যাপ্ত মিঠা পানি সুন্দরবনে আসতে পারে না। পানির গতি কম থাকায় নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে, যা বনের স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার ওপর প্রভাব ফেলছে। সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের ভেতরে শিল্পকারখানাগুলো দূষণ বাড়াচ্ছে। মংলা বন্দরের প্রধান রুট হলো পশুর নদী। এই নদীতে সার, কয়লা ও তেলবাহী জাহাজডুবির ঘটনায় পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায়। ফলে জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। পশুর নদীতে বাড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর পরিমাণ, যা সরাসরি মাছের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। এছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজের উচ্চশব্দ বন্যপ্রাণীদের প্রজনন ও স্বাভাবিক বিচরণকে ব্যাহত করে। সুন্দরবন পর্যটন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। কিন্তু পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট ও পলিথিন বনের মাটিতে মিশে শ্বাসমূলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি রোধ করে। এছাড়া গভীর রাতে পর্যটকদের লঞ্চে জোরালো আলো ও গান-বাজনা বন্যপ্রাণীদের ভয় পাইয়ে দেয় এবং তাদের স্বভাব পরিবর্তন করে। এরইমধ্যে এই সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুন্দরবনের মোট আয়তনের প্রায় ৫২ শতাংশ এলাকাকে বর্তমানে ‘রক্ষিত এলাকা’ বা অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা, এই এলাকাগুলোতে মাছ ধরা বা কোনো ধরনের সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এরপর ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের মাধ্যমে বাঘ, হরিণ এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকারের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং জিপিএস ভিত্তিক ‘SMART’ (স্থানিক নজরদারি ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা) ব্যবহার করে টহল দেওয়া, বনের দুর্গম এলাকায় অপরাধীদের নজরদারি করতে এখন ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে- যা অনেক কার্যকর।

লাবনী আক্তার শিমলা

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়