রমজানে স্কুল-কলেজ আংশিক খোলা রাখার আহ্বান
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিগত কয়েক বছর ধরে এক অভূতপূর্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারি থেকে শুরু করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে ছিল। একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা, আর সেই মেরুদণ্ড আজ নানাবিধ কারণে ভঙ্গুর। ২০২৬ সালের শিক্ষাবর্ষে রমজান মাসে আংশিক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি জাতীয় স্বার্থে একটি সময়ের দাবি। দীর্ঘ ছুটির ফলে সৃষ্ট শিখন ঘাটতি পূরণ এবং শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে এই উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। নিচে বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করা হলো।
বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই বন্ধ রাখতে হয়েছে। গবেষণা বলছে, দীর্ঘ বিরতি শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান বিস্মৃতির দিকে ঠেলে দেয়। ২০২৬ সালে রমজানে যদি ক্লাস চালু থাকে, তবে গত কয়েক বছরের জমে থাকা এই ‘লার্নিং লস’ কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতে নিয়মিত চর্চা না থাকলে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে। তাই আংশিক সময় স্কুল খোলা রেখে সিলেবাসের জটিল অংশগুলো শেষ করা জরুরি।
এটি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রতিটি শ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট কর্মদিবস নির্ধারিত থাকে। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত বন্ধের কারণে বছরের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে দেখা যায় সিলেবাসের বড় একটি অংশ অপূর্ণ থেকে গেছে। রমজানে স্কুল খোলা রাখলে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার বজায় রাখা সহজ হবে এবং বছরের শেষে তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। দীর্ঘ ছুটির অবসরে কিশোর-কিশোরীরা প্রায়ই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।
পাড়া-মহল্লায় আড্ডা এবং লক্ষ্যহীন ঘোরাঘুরির ফলে তারা ‘কিশোর গ্যাং’-এর মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় তারা নিয়মের মধ্যে থাকবে এবং শিক্ষকদের তদারকিতে থাকবে। এতে তাদের বখাটে হয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে শিক্ষার পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। ছুটির দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অবাধ বিচরণ বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘ সময় টিকটক, গেমিং এবং ফেসবুকিংয়ে ব্যয় করার ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। স্কুল খোলা থাকলে তারা বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা করার সুযোগ পাবে এবং ভার্চুয়াল জগতের মোহ থেকে কিছুটা মুক্ত থাকবে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, একটানা স্ক্রিন টাইম শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। রমজানে ক্লাস চালু থাকলে এই ডিজিটাল আসক্তি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে এবং শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী শিক্ষায় মনোযোগী হবে। বছরের শুরুতে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সব পাঠ্যবই সময়মতো হাতে পায় না। এর ফলে শিক্ষাবর্ষের প্রথম দুই-তিন মাস পড়াশোনার গতি অত্যন্ত ধীর থাকে। এই বিলম্বিত শুরুর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রমজানে অতিরিক্ত ক্লাসের প্রয়োজন রয়েছে।
শিক্ষকরা এই সময়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বিশেষ সহায়তা দিতে পারেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ না হলে পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হয়। তাই রমজানে আংশিক পাঠদান এই চাপ বণ্টন করে দিয়ে শিক্ষাবর্ষকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তারা রমজান মাসে পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষকরা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন, তাই পেশাগত নৈতিকতার খাতিরে এই সময়ে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া যৌক্তিক। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্কুল বন্ধ থাকলে শিক্ষকরা ব্যক্তিগতভাবে প্রাইভেট পড়ানো বা কোচিং বাণিজ্যে বেশি জড়িয়ে পড়েন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে এই প্রবণতা কমবে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ের খরচ ছাড়াই মূল প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে। এটি শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতেও সহায়ক হবে।
দেশের বিশাল একটি অংশ কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে, যারা রমজান মাসে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যায়। যদি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো রমজানে খোলা থাকতে পারে, তবে সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কেন বন্ধ থাকবে? এছাড়া আন্তর্জাতিক স্কুলগুলো এবং বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশেই রমজানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকে। এই সামঞ্জস্য বজায় রাখলে জাতীয় পর্যায়ে একটি ঐক্যবদ্ধ কর্মসংস্কৃতি গড়ে উঠবে। রমজানকে ছুটির মাস হিসেবে না দেখে বরকতময় কর্মের মাস হিসেবে দেখা উচিত। দীর্ঘদিন পড়াশোনা থেকে দূরে থাকলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আলস্য ও মানসিক অবসাদ তৈরি হয়। রমজানে ভোরে উঠে সেহরি খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় অলস বসে না থেকে স্কুলে গেলে তাদের শরীর ও মন সচল থাকে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চললে মানুষের হরমোনাল ব্যালেন্স ঠিক থাকে এবং মানসিক একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। স্কুল পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত রাখে, যা রমজানের আত্মসংযমের শিক্ষার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি তাদের অলসতা কাটিয়ে কর্মঠ হতে সাহায্য করবে। অধিকাংশ সচেতন অভিভাবকই চান রমজানে অন্তত আংশিক সময়ের জন্য স্কুল খোলা থাকুক। বাড়িতে দীর্ঘ সময় শিশুরা থাকলে তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া কর্মজীবী বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। স্কুল খোলা থাকলে শিশুরা একটি নিরাপদ ও শিক্ষণীয় পরিবেশে থাকে। অভিভাবকদের মতে, দীর্ঘ ছুটি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অভ্যাস নষ্ট করে দেয়। তাই জনস্বার্থে এবং অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা লাঘবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। রমজান হলো সংযম এবং ধৈর্যের মাস। এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সততা, সহমর্মিতা এবং নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। শুধু পাঠ্যবই নয়, বরং জীবনমুখী শিক্ষা প্রদানের জন্য রমজান একটি আদর্শ সময়। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের রমজানের তাৎপর্য এবং মানবিক আচরণ সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। এটি শিক্ষার্থীদের উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গঠনে সহায়ক হবে। দীর্ঘ ছুটির বদলে এই সময়ে নৈতিক পাঠদান তাদের একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশে ব্যাংক, সচিবালয় এবং অন্যান্য সব সরকারি দপ্তর রমজানে খোলা থাকে। শিক্ষা বিভাগও এই দাপ্তরিক কাঠামোর বাইরে নয়। যদি অন্যান্য পেশাজীবীরা রোজা রেখে কাজ করতে পারেন, তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এটি অসম্ভব নয়। বরং আংশিক সময় (যেমন সকাল ৮টা থেকে ১২টা) ক্লাস নিলে সুবিধা হবে এবং দুপুরের প্রখর রোদের আগেই তারা বাসায় ফিরতে পারবে। এটি সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে সহায়ক। অনেকে মনে করেন রমজানে পড়াশোনা করা ধর্মীয়ভাবে কঠিন। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, বড় বড় জ্ঞানচর্চা ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি রমজান মাসেই সম্পন্ন হয়েছে। পড়াশোনা বা জ্ঞান অর্জন নিজেই একটি ইবাদত। রমজানকে ‘অজুহাত’ হিসেবে ব্যবহার করে কর্মবিমুখ হওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। বরং এই মাসে জ্ঞানার্জনে ব্রতী হওয়া অধিক সওয়াবের কাজ। স্কুল খোলা রেখে শিক্ষার্থীদের এই সঠিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বার্তা দেওয়া সম্ভব যে, কর্ম ও ইবাদত একে অপরের পরিপূরক।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরীক্ষার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠদান সময়মতো শেষ হওয়া জরুরি। রমজানে দীর্ঘ বন্ধ থাকলে সিলেবাস শেষ করার চাপে শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হয়। এটি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। স্কুল খোলা থাকলে শিক্ষকরাই পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে দিতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে।
একটু কৌতুকের ছলে বললে, স্কুল বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের চাপে বাবা-মায়ের ‘রোজা রাখা’ দায় হয়ে পড়ে! বাড়িতে সারাদিন ছোটাছুটি আর ঝগড়াঝাঁটি সামলানোর চেয়ে স্কুলে কয়েক ঘণ্টা থাকা তাদের জন্য বেশি আরামদায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলে গেলে শিশুদের সামাজিক দক্ষতা বাড়ে, যা একাকী ঘরে বসে সম্ভব নয়। রমজানের শান্ত পরিবেশে শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনা বেশি কার্যকর হয়, কারণ চারপাশের কোলাহল কম থাকে। তাই হাসিমুখে স্কুল খোলা রাখাকে স্বাগত জানানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের রমজানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক খোলা রাখা সময়ের দাবি এবং জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে অপরিহার্য। এটি শুধু সিলেবাস শেষ করার মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সুশৃঙ্খল রাখা, সামাজিক অপরাধ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার একটি মহতী উদ্যোগ। সরকারের উচিত একটি সুচিন্তিত নীতিমালা প্রণয়ন করে সকালের শিফটে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও ক্লাস চালু রাখা। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং রাষ্ট্র- সব পক্ষই উপকৃত হবে। শিক্ষার আলো রমজানের পবিত্রতায় আরও প্রজ্জ্বলিত হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল
