তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুর সমাধান চাই

মুহিবুল হাসান রাফি

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে গত সোমবার ও মঙ্গলবার ৪৮ ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। জানা যায়, তিস্তা নদীবেষ্টিত ৫ জেলার ১১টি স্থানে একসঙ্গে এ কর্মসূচি পালন করে দলটি। তিস্তা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি আন্তর্জাতিক নদী। ভারতের সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীটি রংপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলেছে।

তিস্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিন কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। এর মধ্যে বাংলাদেশের দুই কোটির বেশি মানুষ তিস্তার ওপর নির্ভরশীল। তিস্তার ১২ হাজার ১৫৯ বর্গকিলোমিটার অববাহিকায় এই মানুষগুলোর বসবাস ও অবস্থান। এর প্লাবনভূমি ২ হাজার ৭৫০ বর্গকিলোমিটার বিস্তীর্ণ। কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, মাছ ধরা, গৃহস্থালি ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল।

গবেষকদের তথ্য মতে, যথাযথ ব্যবস্থাপনা বা ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তির অভাবে প্রায় ২৫ বছর ধরে তিস্তার অববাহিকায় থাকা বাংলাদেশের মানুষ সংকটে রয়েছে। মূল যে সমস্যাটি বাংলাদেশের মানুষকে ভোগাচ্ছে, সেটি হচ্ছে পানির প্রাপ্যতা সংকট। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শুষ্ক মৌসুমে ভারত এই নদী থেকে একচেটিয়া পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফলে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে কৃষি উৎপাদন মারাত্মভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আবার বর্ষায় মাত্রাতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় এই অঞ্চলটি বন্যার কবলে পড়ছে। ভারত উজানে বাঁধ, ব্যারাজ, জলবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করায় বাংলাদেশে পানির প্রাপ্যতা দারুণভাবে হ্রাস পেয়েছে অথবা বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ এক হাজার ৫০০ কিউসেক থেকে ২০০-৩০০ কিউসেকে নেমে যায়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ভূপৃষ্ঠের পানি কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা অববাহিকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও গত এক দশকে প্রায় ১০ মিটার নিচে নেমে গেছে। বাংলাদেশের প্রধান ফসল বোরো ধান। তিস্তার পানি দিয়ে এই বোরো ধান চাষের ১৪ শতাংশ সেচের কাজ সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ প্রজেক্ট। এই সেচ তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রয়োজনীয় পানির অভাবে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদনে ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট ধান উৎপাদনের নয় শতাংশ। তিস্তার পানি সমস্যার সমাধান না করা গেলে বাংলাদেশের চাল উৎপাদন ২০৩০ ও ২০৫০ সালের মধ্যে কমে যাবে যথাক্রমে ৮ ও ১৪ শতাংশ। কৃষক যেহেতু মরিয়া হয়ে ধান উৎপাদন করতে চাচ্ছেন।

ফলে যান্ত্রিকব্যবস্থা গ্রহণের কারণে কৃষকের সেচের খরচও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এরইমধ্যে উত্তরবঙ্গের খাল-বিল-পুকুর-জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে। ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিএনপির উল্লিখিত অবস্থান কর্মসূচিতে তিস্তা অববাহিকার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা কারও করুণার বিষয় নয়।

আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী পানি বাংলাদেশের প্রাপ্য। কিন্তু ভারত তিস্তা চুক্তিতে অনীহা প্রকাশ করে আসছে। তারেক রহমান যথার্থই বলেছেন, আন্তর্জাতিক নদী আইন (ইন্টারন্যাশনাল রিভারাইন ল’) অনুযায়ী ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা নদীর পানি-যুক্তি হওয়া জরুরি। জাতিসংঘে গৃহীত কনভেনশনে পানিসম্পদ ব্যবহারবিষয়ক ‘আর্টিকেল-৫’-এ বলা হয়েছে, অভিন্ন বা আন্তর্জাতিক নদীর উপকূলবর্তী দেশগুলো ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পানিসম্পদ ব্যবহার করবে। ভারতের তাই উচিত তিস্তা চুক্তি করে বাংলাদেশের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা এই সমস্যাটির সমাধান করা। ২০১১ সালে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু বেশ কয়েকবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে ভারত আর এই চুক্তিতে আগ্রহ দেখায়নি।

বিষয়টি যেহেতু বিএনপি আবার সামনে নিয়ে এসেছে, আন্দোলন করছে, আন্তর্জাতিক মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, সুতরাং এখন এর সুরাহা হওয়া দরকার। বাংলাদেশ চুক্তি সম্পাদনের জন্য মুখিয়ে আছে। ভারতেরও উচিত এই যুক্তি সম্পাদনে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসা। বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের জনগণের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি ও সুসম্পর্কের জন্য তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির আসলে কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিবেশীর সমৃদ্ধি মানে নিজেরও সমৃদ্ধি। অন্যের স্থিতিশীলতা মানে নিজেরও নিরাপদে থাকা।

মুহিবুল হাসান রাফি

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ