নতুন ভোরের প্রত্যাশায় বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন পুরো দেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকে। জীর্ণকে পেছনে ফেলে নতুনের আবাহনে জেগে ওঠার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এখন বাংলাদেশের সামনে। ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তার মূল লক্ষ্যই হলো- একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন। এই প্রেক্ষাপটে ‘দেশ গঠনে মিশন সফল হোক’ এটি শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং ১৮ কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন। তবে এই মিশন সফল করা যেমন গৌরবের, তেমনি এটি এক বিশাল চ্যালেঞ্জের পথ।

বাংলাদেশ তার ৫৩ বছরের পথচলায় বহু চড়াই-উতরাই পার করেছে। বারবার গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছে, জেঁকে বসেছে দুর্নীতি আর ক্ষমতার দম্ভ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের শিখিয়েছে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তরুণ প্রজন্মই হাল ধরে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সাধারণ মানুষের সামনে এখন প্রধান লক্ষ্য হলো- রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে সংস্কার করা। মানুষ এখন এমন এক বাংলাদেশ চায়, যেখানে ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে, বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে এবং মেধার মূল্যায়ন হবে। একটি রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজাতে হলে শুধু উপরিভাগের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন। সম্পাদকীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেশ গঠনে নিচের ক্ষেত্রগুলোতে সংস্কার জরুরি-

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখা এবং বিচারপ্রার্থীদের জন্য হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে এই মিশনের প্রথম ধাপ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা এখন সময়ের দাবি। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং মেগা প্রকল্পের আড়ালে হওয়া লুটপাট বন্ধ করে সাধারণ মানুষের পকেটে স্বস্তি ফেরাতে হবে। আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সরকারিসেবা পেতে সাধারণ মানুষকে যেন দুর্নীতির দ্বারস্থ হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের বিতর্ক মেটানো এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তরুণদের সক্ষম করে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের সিন্ডিকেট ভেঙে তৃণমূল মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

দেশ গঠনের মিশনে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে বিভাজনের রাজনীতি। আমরা অতীতে দেখেছি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কীভাবে উন্নয়নের পথকে রুদ্ধ করেছে। এখন সময় এসেছে প্রতিহিংসা ভুলে জাতীয় ঐক্যের। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কীভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন করা যায়, সেটাই হবে প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচয়। কোনো গোষ্ঠী বা বিশেষ মতাদর্শের একক আধিপত্য যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

পথটি মোটেও মসৃণ নয়। পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং অতি-আবেগ অনেক সময় মিশনকে ব্যাহত করতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, কোনো পরিবর্তনই রাতারাতি সম্ভব নয়। ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের উদ্যম এবং অভিজ্ঞদের প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটাতে হবে। একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার দালানকোঠায় নয়, বরং তার নাগরিকদের সততা এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে নিহিত থাকে। দেশ গঠনের এই মহাযজ্ঞে প্রতিটি নাগরিকের ভূমিকা রয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলা থেকে শুরু করে কর প্রদান করা- সবই এই মিশনের অংশ। আমরা যদি ব্যক্তিগত জীবনে পরিবর্তন না আনি, তবে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন স্থায়ী হবে না।

বাংলাদেশ এখন এক বিশাল সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে। এই মিশন সফল হওয়ার অর্থ হলো- একটি নিরাপদ আগামীর নিশ্চয়তা, যেখানে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে। দীর্ঘদিনের জঞ্জাল পরিষ্কার করতে সময় লাগবে; কিন্তু আমাদের সংকল্প যদি দৃঢ় থাকে, তবে বিজয় সুনিশ্চিত।

পরিশেষে, আমরা বিশ্বাস করি, রক্তস্নাত এই জনপদ তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। রাষ্ট্র সংস্কারের এই শুভযাত্রা সার্থক হোক। সকল সংকীর্ণতা কাটিয়ে ‘দেশ গঠনে মিশন সফল হোক’ এটাই হোক আমাদের আজকের শপথ। ইতিহাস যেন আমাদের ক্ষমা করতে পারে- এমন এক বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের পরম লক্ষ্য।