নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন : আলোচনা-সমালোচনাই হোক অগ্রযাত্রার ভিত্তি

এম মহাসিন মিয়া

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ আজ পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উন্নয়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির অগ্রগতির দৃশ্যমান সাফল্য, অন্যদিকে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রশ্ন। একটি বিষয় স্পষ্ট, যে রাষ্ট্রে মুক্ত আলোচনা ও গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ সংকুচিত হয়, সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র গড়ে তুলতে পারে না। তাই নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে ভয়মুক্ত মতপ্রকাশের পরিবেশ।

গণতন্ত্র কেবল ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। জনগণের অংশগ্রহণ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, নীতি ও আইন নিয়ে স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব দেশে পার্লামেন্ট, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে উন্মুক্ত বিতর্কের ঐতিহ্য রয়েছে, সেসব দেশই দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জন করেছে। সমালোচনা সেখানে রাষ্ট্রের বিরোধিতা নয়, বরং রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ও দায়বদ্ধ করার একটি উপায়।

আমাদের সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে সেই অঙ্গীকারের ফারাক অনেক সময় চোখে পড়ে। ভিন্নমতকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা, সমালোচনাকে শত্রুতার সমার্থক মনে করা কিংবা প্রশ্ন তোলাকে অসহিষ্ণুতার মাধ্যমে দমন করা, এসব প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। যখন মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, তখন ভুল নীতি ও দুর্নীতি আড়ালে থেকে যায়। তখনই রাষ্ট্র নিজেকে সংশোধনের সুযোগ হারায়।

উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল সেতু, সড়ক বা অট্টালিকার সংখ্যা নয়। একটি রাষ্ট্র কতটা উদারভাবে সমালোচনা গ্রহণ করে, কতটা স্বচ্ছভাবে জবাব দেয় এবং কতটা সাহসের সঙ্গে ভুল স্বীকার করে, সেই সক্ষমতাই প্রকৃত অগ্রগতির সূচক। সমালোচনা এক ধরনের আয়না, আয়না ভাঙলে মুখের ত্রুটি মুছে যায় না, বরং তা অদৃশ্য হয়ে থেকে যায়।

বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শ কাতর ও বৈচিত্র্যময় অঞ্চলে মুক্ত মতবিনিময় অত্যন্ত জরুরি। বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে সংলাপের ঘাটতি অবিশ্বাস ও দূরত্ব তৈরি করে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি বা বান্দরবানের মানুষের সমস্যাগুলো জাতীয় আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। ভূমি, উন্নয়ন বৈষম্য, নিরাপত্তা কিংবা সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নে খোলামেলা আলোচনা না হলে টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। নতুন বাংলাদেশ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রান্তিক অঞ্চলের কণ্ঠও কেন্দ্রের সমান শক্তিতে উচ্চারিত হবে।

মুক্ত আলোচনা-সমালোচনার পরিবেশ গড়ে তুলতে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, এমন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন ও সংস্কার করতে হবে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অযথা সীমাবদ্ধ না করে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক আচরণে জবাবদিহিতা ও সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে, যেখানে বিরোধী মতকে শত্রু নয়, বরং গণতান্ত্রিক অংশীদার হিসেবে দেখা হবে। চতুর্থত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে নির্ভয় থাকতে পারে।

এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক, গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যাতে মতবিনিময় হয় তথ্যনির্ভর ও শালীন ভাষায়। আমাদের সামাজিক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, ভিন্নমত মানেই দেশবিরোধিতা নয়, বরং সেটিই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি।

সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একটি আত্মবিশ্বাসী সরকার সমালোচনাকে ভয় পায় না, বরং তা থেকে শিক্ষা নেয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাই জনগণের আস্থা অর্জনের প্রধান উপায়। তাই নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রথম শর্ত হওয়া উচিত, মুক্ত আলোচনা ও যুক্তিনির্ভর সমালোচনার দ্বার উন্মুক্ত রাখা।

নতুন বাংলাদেশ কোনো স্লোগান নয়, এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে প্রয়োজন ভয়মুক্ত কণ্ঠ, উন্মুক্ত বিতর্ক এবং সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ আলোচনা-সমালোচনাই গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত রাখে, আর গণতন্ত্রই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রের ভিত্তি।

এম মহাসিন মিয়া

লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা