বইমেলা : প্রকাশনা শিল্পের অর্থনীতি

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে বইমেলা শুধু একটি বার্ষিক আয়োজন নয়। এটি জাতিসত্তা, স্মৃতি ও জ্ঞানচর্চার সম্মিলিত প্রতীক। বিশেষ করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আমাদের ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে ধারণ করে গড়ে উঠেছে। এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়, পাঠাভ্যাসের পুনর্জাগরণ এবং সৃজনশীলতার সম্মিলিত উৎসব। ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি-এর আয়োজনে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকাজুড়ে যে বিশাল আয়োজন দেখা যায়, তা নিছক বই কেনাবেচার বাজার নয়। একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম। তবে প্রশ্ন হলো- এই আয়োজন কি সত্যিই পাঠাভ্যাস ও মানসম্পন্ন সাহিত্যচর্চা বাড়াচ্ছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে উৎসবকেন্দ্রিক ভোগসংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠছে? বইমেলাকে ঘিরে যে সামাজিক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়, তা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের স্পন্দনকে দৃশ্যমান করে। বইমেলার সূচনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে। শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসকে বইপ্রকাশ ও পাঠাভ্যাসের মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এ মেলা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার বৃহত্তম প্ল্যাটফর্মে। নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ, প্রতিষ্ঠিত লেখকের নতুন গ্রন্থ, গবেষণাধর্মী প্রকাশনা- সব মিলিয়ে বইমেলা হয়ে ওঠে বার্ষিক সাহিত্য-মানচিত্রের কেন্দ্রবিন্দু। একুশের বইমেলা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়।

দেশের বিভিন্ন জেলা-শহরেও স্থানীয়ভাবে বইমেলা আয়োজনের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। ফলে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে বইয়ের বিস্তার ঘটছে, যা পাঠাভ্যাসকে গণমুখী করতে সহায়তা করছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বাণিজ্যিকতা। প্রকাশকদের বড় অংশ এখন সারা বছরের পরিকল্পনা করেন বইমেলাকে কেন্দ্র করে। নতুন বই প্রকাশের টাইমিং, লেখক-ভিত্তিক ব্র্যান্ডিং, প্রচ্ছদনির্ভর বিপণন- সব মিলিয়ে বইমেলা এখন একটি শক্তিশালী বাজারব্যবস্থা। এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে প্রকাশনা শিল্প টিকে থাকে, কর্মসংস্থান বাড়ে, লেখক আর্থিক স্বীকৃতি পান। তবে নেতিবাচক দিকও স্পষ্ট- বইয়ের মানের চেয়ে বিক্রিযোগ্যতা অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পাওয়া। বইমেলা প্রকাশনা শিল্পের জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। দেশের প্রকাশনা শিল্পের বার্ষিক অর্থনৈতিক সূচকের বড় অংশ নির্ধারণ করে। নতুন বই প্রকাশ, পুনর্মুদ্রণ, প্রচার-প্রচারণা- সবকিছু ঘিরে একটি অর্থনৈতিক চক্র সক্রিয় হয়। কাগজ, মুদ্রণ, বাঁধাই, পরিবহন, স্টল নির্মাণ, ডিজাইন ও বিপণন- এসব খাতে বিপুল অস্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। বহু প্রকাশকের বার্ষিক আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে এই এক মাসেই। বিক্রি কি টেকসই পাঠাভ্যাসের প্রতিফলন, নাকি মৌসুমি ক্রয়-উৎসাহ? অনেক পাঠক মেলায় বই কিনলেও সেগুলো পড়া হয় না। অর্থাৎ বই কেনা আর বই পড়া এক নয়। যদি পাঠাভ্যাস সারা বছর সমানভাবে না বাড়ে, তবে বইমেলার অর্থনৈতিক সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে সীমিত প্রভাব ফেলতে পারে। ডিজিটাল যুগে ই-বুক ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রসার সত্ত্বেও মুদ্রিত বইয়ের চাহিদা এখনও দৃশ্যমান। বিশেষ করে কিশোর সাহিত্য, অনুবাদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণা, সমকালীন উপন্যাস ও কবিতার বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বই-প্রচার বিক্রি বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ফলে বইমেলা এখন অফলাইন-অনলাইন সমন্বিত বিপণনের এক মডেল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক নতুন বই প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ লেখকদের প্রথম গ্রন্থ। এটি ইতিবাচক দিক কারণ এর মাধ্যমে নতুন কণ্ঠের উন্মেষ ঘটছে। কিন্তু মাননিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সম্পাদনা, প্রুফরিডিং বা গবেষণাভিত্তিক যাচাই ছাড়া বই প্রকাশিত হয়। ফলে নিম্নমানের বই বাজারে আসার ঝুঁকি বাড়ে। এখানে একটি যুক্তি হলো- বাজার নিজেই মান নির্ধারণ করবে, পাঠক ভালো বই বেছে নেবেন। কিন্তু বাস্তবে প্রচারণা, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব পাঠকের পছন্দকে প্রভাবিত করছে। ফলে মানসম্মত অথচ প্রচারবিমুখ বই অনেক সময় আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি ও প্রকাশক সমিতির আরও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন- সম্পাদনার মানদণ্ড, গবেষণাভিত্তিক প্রকাশনা উৎসাহ এবং পুরস্কার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ডিজিটাল যুগে তরুণদের মনোযোগ বিভক্ত। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কনটেন্ট- এসবের মধ্যে বই পড়া প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। বইমেলা তরুণদের জন্য এক ধরনের রিমাইন্ডার হিসেবে কাজ করে- বই এখনও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু শুধু মেলা আয়োজন করলেই হবে না। বিষয়বস্তুর আধুনিকীকরণ জরুরি। গ্রাফিক নভেল, বিজ্ঞানভিত্তিক জনপ্রিয় বই, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা বিষয়ক প্রকাশনা, অনুবাদ সাহিত্য- এসব বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অডিওবুক ও ই-বুকের সমন্বয় করলে পাঠকসংখ্যা বাড়তে পারে। বইমেলা যদি শুধু ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে থাকে, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ হারাতে পারে। বইমেলা এক ধরনের নাগরিক সংস্কৃতির চর্চা। পরিবার নিয়ে মেলায় যাওয়া, লেখকের সঙ্গে মতবিনিময়, আলোচনা সভা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ- এসব গণতান্ত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ। মুক্ত আলোচনা ও মতপ্রকাশের পরিবেশ একটি সুস্থ সমাজের জন্য অপরিহার্য। তবে নিরাপত্তা, ভিড় ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সেন্সরশিপের প্রশ্নও বিবেচ্য। কোনো বই বিতর্কিত হলেই তা সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। বইমেলা হওয়া উচিত বহুমতের সহাবস্থানের স্থান- যেখানে ভিন্নমত যুক্তির মাধ্যমে আলোচিত হবে, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়। অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মাননিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে নিম্নমানের বই বাজারে আসে। তাই মানসম্মত সম্পাদনা ও বাছাই প্রক্রিয়া জোরদার করা জরুরি। বইমেলা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। যদিও জেলা পর্যায়ে মেলা আয়োজন হয়, তবু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বই পৌঁছানোর ব্যবস্থা এখনও সীমিত। একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে- ভ্রাম্যমাণ বইমেলা, স্কুলভিত্তিক পাঠচক্র, গ্রন্থাগার উন্নয়ন প্রকল্প। বইমেলার প্রভাব যদি রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছায়, তবেই এটি সত্যিকার অর্থে জাতীয় উৎসবে পরিণত হবে। নিয়মিত বইপড়া ব্যক্তির ভাষাগত দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়। একুশের বইমেলায় শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা কর্নার, গল্পপাঠ, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক আয়োজন তাদের মানসিক বিকাশে সহায়ক। পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও প্রয়োজন। গ্রন্থাগার সংস্কৃতি জোরদার করা গেলে বইমেলার প্রভাব সারা বছর ধরে টেকসই হবে। বইমেলার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে- উচ্চমূল্যের কাগজ, মুদ্রণ ব্যয় বৃদ্ধি, পাইরেসি, এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল বিভ্রান্তি। অনেক পাঠক অনলাইন কনটেন্টে অভ্যস্ত হওয়ায় গভীর পাঠে আগ্রহ কমছে। এ অবস্থায় প্রকাশকদের নতুন কৌশল নিতে হচ্ছে- গ্রাফিক নভেল, অডিওবুক, তরুণবান্ধব ভাষা ও বিষয়বস্তু প্রাধান্য পাচ্ছে। অন্যদিকে সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত; প্রবাসী পাঠকের জন্য অনলাইন বিক্রি ও আন্তর্জাতিক শিপমেন্ট বাড়ছে। অনুবাদ সাহিত্য বিশ্ববাজারে বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছে দিতে পারে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, কপিরাইট সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বইমেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকাশনা শিল্পকে আরও প্রসারিত করা সম্ভব। বইমেলা আমাদের জাতিসত্তা, ভাষা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অংশ। তবে এটিকে শুধু আবেগের উৎসব হিসেবে রাখলে চলবে না। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের বাস্তব কৌশলে রূপ দিতে হবে। মানসম্পন্ন প্রকাশনা, টেকসই পাঠাভ্যাস, ডিজিটাল সমন্বয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক বিস্তার- এই পাঁচটি দিক নিশ্চিত করতে পারলে বইমেলা হবে শুধু এক মাসের আয়োজন নয়, সারা বছরের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সূচনা। বইমেলা নিয়ে আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত সমালোচনামূলক সমর্থনের- উৎসবকে স্বাগত, কিন্তু মান ও চিন্তার প্রশ্নে আপস নয়। তাহলেই বইমেলা সত্যিকার অর্থে জাতির আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়