প্রত্যাশার নতুন দিগন্ত শান্তি ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ চাই

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি রাষ্ট্র যখন পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়ায়, তখন তার সামনে প্রধান দুটি স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায় ‘শান্তি’ ও ‘সমৃদ্ধি’। বাংলাদেশ আজ এমনই এক বাঁক বদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, অগণিত ত্যাগ আর অমিত সম্ভাবনার এই জনপদে সাধারণ মানুষের চাওয়া খুব সহজ- একটি নিরাপদ পরিবেশ এবং সচ্ছল জীবন। ‘শান্তি-সমৃদ্ধির বাংলাদেশ চাই’ শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি ১৬ কোটি মানুষের প্রাণের আকুতি এবং আগামীর পথচলার মূলমন্ত্র।

শান্তি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি সুশাসনের ফসল। কোনো সমাজে যখন আইনের শাসন থাকে না এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সেখানে অশান্তির বীজ রোপিত হয়। গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে পরমতসহিষ্ণুতা এবং আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা শান্তির প্রথম শর্ত। নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। ভয়হীন পরিবেশে কথা বলা এবং নিজের অধিকার চর্চা করতে পারার মধ্যেই প্রকৃত শান্তি নিহিত। বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যই বাংলাদেশের সৌন্দর্য। সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে উগ্রবাদ ও বিভেদ দূর করা সম্ভব। ‘শান্তি মানে শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, শান্তি মানে ন্যায়ের উপস্থিতি।’ এই দর্শনেই আমাদের সমাজ কাঠামো পুনর্গঠন করতে হবে।

শান্তি বজায় রাখার জন্য টেকসই সমৃদ্ধি অপরিহার্য। অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না। বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক বিশাল সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তবে চ্যালেঞ্জগুলোও কম নয়। আমাদের জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) কাজে লাগাতে হবে। লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার যুবকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলে সমৃদ্ধি অধরাই থেকে যাবে। কারিগরি শিক্ষা ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিকাশ এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সমৃদ্ধির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের করের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখালেও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতকে চাঙ্গা করতে হবে যাতে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে সমৃদ্ধির চাবিকাঠি হলো তথ্যপ্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স এবং ডাটা সায়েন্সের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পারি। তবে এই যাত্রায় ‘ডিজিটাল বিভেদ’ দূর করা জরুরি। শহরের পাশাপাশি প্রান্তিক গ্রামগুলোতেও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতে হবে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আমাদের সমৃদ্ধি টেকসই করতে হলে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং নদী রক্ষা ও বনায়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন আসে, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

রাষ্ট্রের একার পক্ষে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা।প্রাত্যহিক জীবনে সততা চর্চা এবং দায়িত্ব পালনই দেশপ্রেমের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকবেই, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আমাদের এক হতে হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই চেতনা- যেখানে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল- তা আজও প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশ কোনো দরিদ্র বা সহায়-সম্বলহীন দেশ নয়; এটি শ্রমজীবী মানুষ, উদ্যমী তরুণ আর উর্বর পলিমাটির এক অমিত সম্ভাবনার দেশ। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের সীমাবদ্ধতা নেই। শান্তি ও সমৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক- শান্তি ছাড়া সমৃদ্ধি টেকসই হয় না, আর সমৃদ্ধি ছাড়া শান্তি ভঙ্গুর। আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক- একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার, যেখানে প্রতিটি নাগরিক মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার পাবে। হিংসা-বিদ্বেষের দেওয়াল ভেঙে আমরা যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করি, তবে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন আর স্বপ্ন থাকবে না, তা হবে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা।