গণতন্ত্র রক্ষায় স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকল্প নেই
আব্দুল কাদের জীবন
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য চারটি স্তম্ভের অন্যতম হলো গণমাধ্যম। একে বলা হয় রাষ্ট্রের দর্পণ, সমাজের অতন্দ্র প্রহরী। প্রান্তিক কৃষকের আর্তনাদ থেকে শুরু করে উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমের আলোচনা—সবই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলে পৌঁছানোর প্রধান বাহন হলো সংবাদপত্র ও টেলিভিশন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিগত কয়েক দশকে গণমাধ্যমের এই পথচলা সংকীর্ণ হয়ে আছে। বরং বারবার ‘অশুভ শক্তির’ কালো ছায়ায় গণমাধ্যম তার নিজস্ব জৌলুস হারিয়েছে। জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়ে এটি অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠেছিল শাসকের আজ্ঞাবহ এক যন্ত্র। আজ প্রশ্ন উঠেছে, গণমাধ্যম কি আদৌ স্বাধীন হবে? নাকি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ পরিবর্তনের মতো শুধু মালিকপক্ষের চেহারা বদলাবে?
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের চারজন সাংবাদিককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। তাদের তথাকথিত ‘অপরাধ’ ছিল ছাত্র-জনতার মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবস্থান নেওয়া। এটি শুধু চারজন ব্যক্তির চাকরিচ্যুতির প্রশ্ন নয়; বরং এটি বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা অশুভ শক্তির নগ্ন হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত। জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট ছিল বাক-স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। অথচ সেই আন্দোলনের পক্ষে কথা বলায় যদি সাংবাদিকদের কর্মস্থল হারাতে হয়, তবে তা হবে একটি চরম মানবাধিকার লঙ্গন।
এই ঘটনার দায়ভার কোনোভাবেই বর্তমান সরকার এড়াতে পারে না। যদি এই চার সাংবাদিককে সম্মানে তাদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা না হয়, তবে এটি হবে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের ওপর প্রথম বড় আঘাত। গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রের এই অদৃশ্য চাপ বা নগ্ন হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। সরকার যদি এই সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা না রাখে, তবে তা তাদের প্রথম ও প্রধান ব্যর্থতা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় খোদাই হয়ে থাকবে।
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গণমাধ্যমের ওপর যে স্টিমরোলার চালানো হয়েছে, তার ক্ষত এখনও শুকায়নি। দীর্ঘ ১৭ বছর আমরা দেখেছি কীভাবে ভিন্নমতের সংবাদমাধ্যমগুলোকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশনসহ আরও অনেক গণমাধ্যম জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিকদের ওপর নেমে এসেছিল অকথ্য নির্যাতন। প্রবীণ সম্পাদকদের লাঞ্ছিত করা থেকে শুরু করে সংবাদপত্রের অফিসে অগ্নিসংযোগ- কোনো কিছুই বাদ যায়নি। বিশেষ করে দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং আমার দেশ-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যে দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন, তা গণমাধ্যমের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। আবার মুদ্রার উল্টো পিঠে আমরা দেখেছি ‘জনরোষের’ নামে গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও অনেক জায়গায় অসহিষ্ণুতা দেখা গেছে। যদিও এই সরকারের সময় গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় কোনো চাপ ছিল না। মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা ছিল। একটি স্বাধীন দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে বর্তমানে সবচেয়ে বড় দেয়াল হলো এর ‘মালিকানা ব্যবস্থা’। দেশের অধিকাংশ প্রভাবশালী গণমাধ্যম এখন বড় বড় কর্পোরেট জায়ান্টদের কবজায়। একেকটি শিল্পগোষ্ঠী একাধিক টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা পরিচালনা করছে। তাদের মূল লক্ষ্য সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং নিজেদের ব্যবসার সুরক্ষা দেওয়া। এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থায়ন করে এবং বিনিময়ে ক্ষমতাশীল হওয়ার পর অনৈতিক ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় করে নেয়। এই ‘তোষামোদি সাংবাদিকতা’র ফলে গণমাধ্যম এখন হয়ে পড়েছে কর্পোরেট হাউজের জনসংযোগ বিভাগ। সরকার চাইলেও অনেক সময় সংস্কার করতে পারছে না, কারণ এই কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারকদের গভীর সখ্যতা থাকে। গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা শুল্ক ফাঁকি, ব্যাংক ঋণ বা টেন্ডারবাজির মতো কাজগুলো জায়েজ করে নেয়। এই পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে হলে গণমাধ্যমের মালিকানা নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থ যেন সাংবাদিকের কলমকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
একজন সাধারণ গণমাধ্যমকর্মী তার নিজ অফিসেই কতটা অসহায়, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নিজের বিবেকের পরিবর্তে অফিসের ‘এজেন্ডা’ অনুযায়ী সংবাদ তৈরি করতে হয়। সত্য প্রকাশের সাহস দেখালেই নেমে আসে ছাঁটাইয়ের খড়গ। এর ওপর রয়েছে নামমাত্র বেতন এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ধকল। অনেক নামী প্রতিষ্ঠানেও মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকে। পেশাগত এই অনিশ্চয়তার কারণে মেধাবীরা আজ সাংবাদিকতা বিমুখ হচ্ছে। এর ফলে সুযোগ নিচ্ছে গুজবচক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের বন্যায় মূলধারার সাংবাদিকতা আজ গুরুত্ব হারাতে বসেছে। মানুষ যখন দেখে গণমাধ্যম সত্য গোপন করছে, তখন তারা বিকল্প ও অনির্ভরযোগ্য উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই আস্থার সংকট কাটানোর দায় রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম মালিক- উভয়কেই নিতে হবে।
জুলাই পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম সংস্কারের জোরালো দাবি উঠেছিল। একটি খসড়া আইন তৈরির কথা শোনা গেলেও তা রহস্যজনকভাবে হিমাগারে চলে গেছে। সংস্কারের পথ যতই পিচ্ছিল হোক, সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা স্বৈরতন্ত্রকেই আমন্ত্রণ জানায়। গণতন্ত্র রক্ষায় স্বাধীন গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে যে, গণমাধ্যমকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার অর্থ হলো দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে দুর্বল করা। যদি সরকার আন্তরিক হয়, তবে আমূল সংস্কার সম্ভব। সাংবাদিকদের জন্য স্বাধীন ওয়েজ বোর্ড গঠন, চাকরি সুরক্ষা আইন এবং মালিকপক্ষের হস্তক্ষেপ বন্ধে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
গণমাধ্যম কবে স্বাধীন হবে- এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র এবং মালিকপক্ষের সদিচ্ছার ওপর। সাংবাদিকরা যদি নির্ভয়ে সত্য লিখতে না পারেন, তবে সেই সমাজ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। আমরা চাই এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে সাংবাদিকরা কোনো নির্দিষ্ট দলের বা গোষ্ঠীর তল্পিবাহক হবেন না, বরং তারা হবেন জনগণের কণ্ঠস্বর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে গণমাধ্যমকে সব ধরনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হবে। তবেই ফিরবে জনগণের আস্থা, তবেই সার্থক হবে গণতন্ত্রের এই চতুর্থ স্তম্ভের পথচলা। পথ কঠিন, কিন্তু যাত্রা শুরু করাটা এখন সময়ের দাবি।
আব্দুল কাদের জীবন
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
