প্লাস্টিক সভ্যতা বনাম পাটের পুনর্জাগরণ
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে মানব সভ্যতা এক অদ্ভুত দ্বিধায় দাঁড়িয়ে। একদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ, অন্যদিকে নিজের তৈরি বর্জ্যরে স্তূপে শ্বাসরোধ হওয়ার উপক্রম। এই দ্বান্দ্বিক অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘প্লাস্টিক সভ্যতা’। গত কয়েক দশকে সস্তা, টেকসই ও সহজলভ্য হওয়ার সুবাদে প্লাস্টিক আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই তথাকথিত সুবিধা আজ পৃথিবীর জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ। এই সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আধুনিক বিশ্ব আজ আবার ফিরে তাকাচ্ছে ঐতিহ্যের দিকে- শুরু হয়েছে ‘পাটের পুনর্জাগরণ’।
প্লাস্টিক আধুনিক জীবনের প্রতিটি রন্ধ্রে মিশে আছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত আমরা যা কিছু স্পর্শ করি, তার সিংহভাগই প্লাস্টিক। তবে এই ‘প্লাস্টিক সভ্যতা’ আসলে একটি ক্ষণস্থায়ী সুবিধার দীর্ঘস্থায়ী মূল্য। প্লাস্টিক পচতে সময় নেয় প্রায় ৪০০ থেকে ১০০০ বছর। ফলে এটি মাটি ও পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করছে।
বর্তমান বিশ্বে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা আজ খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের রক্তে ও মগজে পৌঁছে গেছে। সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে, সামুদ্রিক প্রাণীরা প্লাস্টিককে খাদ্য ভেবে গ্রহণ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। প্লাস্টিক পোড়ালে নির্গত হয় বিষাক্ত ডাইঅক্সিন ও ফুরান, যা ক্যান্সারসহ নানা মরণব্যাধির কারণ। এই ভয়াবহ বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্লাস্টিক নির্ভরতা আসলে একটি আত্মঘাতী পথ।
এক সময় ‘সোনালী আঁশ’ হিসেবে পরিচিত পাট ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ। মাঝে প্লাস্টিক ও পলিমারের আগ্রাসনে পাট তার জৌলুস হারিয়েছিল। কিন্তু পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা আবার তুঙ্গে উঠছে। পাটের পুনর্জাগরণ শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি পরিবেশ রক্ষার একটি আন্দোলন।
পাট সম্পূর্ণ পচনশীল এবং পরিবেশবান্ধব। এটি মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং বায়ুমণ্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। পাটের বহুমুখী ব্যবহারের ক্ষেত্র এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। শুধু বস্তা বা দড়ি নয়, পাটের আঁশ দিয়ে এখন তৈরি হচ্ছে- উচ্চমূল্যের পোশাক ও ফ্যাশন পণ্য, পরিবেশবান্ধব পলিথিন (যেমন: সোনালী ব্যাগ), গাড়ির ড্যাশবোর্ড ও ইন্টেরিয়র পার্টস, নির্মাণ সামগ্রী এবং আসবাবপত্র, ক্ষত নিরাময়ে ব্যবহৃত বিশেষ ব্যান্ডেজ ও টিস্যু পেপার।
প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে পাটের এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় বাধা হলো খরচ এবং সহজলভ্যতা। প্লাস্টিক সস্তা হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ সহজেই এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশগত ক্ষতির কথা বিবেচনা করলে পাটের তৈরি পণ্যই সবচেয়ে সাশ্রয়ী। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিত করতে হবে এবং পাটের পণ্যকে জনপ্রিয় করতে ভর্তুকি ও গবেষণা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে আবিষ্কৃত পাটের পলিমার বা ‘সোনালী ব্যাগ’ এই লড়াইয়ে একটি গেমণ্ডচেঞ্জার হতে পারে। যদি এর বাণিজ্যিক উৎপাদন বড় পরিসরে শুরু করা যায়, তবে এটি বিশ্বজুড়ে একক ব্যবহারের প্লাস্টিকের (ঝরহমষব-ঁংব ঢ়ষধংঃরপ) বিকল্প হিসেবে বিপ্লব ঘটাবে।
আগামীর পথ ও সম্ভাবনা : পাটের পুনর্জাগরণ সফল করতে হলে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা জরুরি। বাজার থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগ বর্জনের মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। এছাড়া পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জীবনরহস্য উন্মোচনের ফলে উচ্চফলনশীল ও উন্নত মানের পাট উৎপাদন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। ‘প্রকৃতির দিকে ফিরে যাওয়াই এখন টিকে থাকার একমাত্র পথ। প্লাস্টিক আমাদের বর্তমানকে সহজ করলেও ভবিষ্যৎকে অন্ধকার করে দিচ্ছে। সেখানে পাট দিচ্ছে এক সবুজ ও সুরক্ষিত পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি।’
প্লাস্টিক সভ্যতা আজ ক্লান্ত, বিষাক্ত এবং ক্ষতিকারক। অন্যদিকে পাটের পুনর্জাগরণ হলো প্রাণের স্পন্দন ও প্রকৃতির বিজয়গান। আমরা যদি এখনই প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের বহুমুখী ব্যবহারের দিকে ধাবিত না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা একটি বাসযোগ্য পৃথিবী দিয়ে যেতে পারব না। পাটের এই নবযাত্রা শুধু বাংলাদেশের কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে না, বরং পুরো বিশ্বকে প্লাস্টিক দূষণ থেকে মুক্তির পথ দেখাবে। সোনালী আঁশের সুদিন ফিরে আসা মানেই পৃথিবীর ফুসফুস আবার সতেজ হয়ে ওঠা।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
