ইফতারের টেবিলে স্বস্তি নাকি দীর্ঘশ্বাস

রাকিবুল ইসলাম

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রমজানের পবিত্র আভা যখন আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশান্তির বদলে এক অজানা আতঙ্ক ভর করে। সেই আতঙ্কটি হলো বাজারের আগুনের। প্রতি বছরের মতো এবারও রমজানের প্রথম দিকে দাঁড়িয়ে আমরা এক চিরচেনা কিন্তু আরও গাঢ় ও নির্মম চিত্রের মুখোমুখি হয়েছি। ইফতারের চিরাচরিত মেনুতে যে পদগুলো থাকার কথা, সেগুলোর দাম এখন সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে, যেন প্রতিটি পণ্যই আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

এক গ্লাস লেবুর শরবত দিয়ে রোজা ভাঙা এখন বিলাসিতার পর্যায়ে চলে গেছে। কারণ কয়েক সপ্তাহ আগের ৪০-৫০ টাকা হালির লেবু এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকায়। শুল্ক কমানোর সরকারি ঘোষণার পরও সাধারণ জাহিদি থেকে শুরু করে উন্নত মানের খেজুরে কেজিতে বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। মুড়ি-জিলাপির স্বাদ যেন চিনির চড়া দামে ফিকে হয়ে গেছে। আর ইফতারের প্রধান আকর্ষণ বেগুনির কথা তো বলাই বাহুল্য; বেগুন আর শসার দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে, আর কাঁচামরিচের ঝাল পৌঁছেছে ২০০-২৪০ টাকায়। একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ইফতারের বাজেট গত বছরের তুলনায় ৩০-৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়াটা এখন এক যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতা।

রমজান মানেই তো সংযম, আত্মশুদ্ধি আর ভ্রাতৃত্ববোধ। কিন্তু আমাদের বাজারের দৃশ্যপট দেখলে মনে হয়, এই পবিত্র মাসটি যেন এক শ্রেণির মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর পকেট ভরার মহোৎসব। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম হওয়ার পরও রমজানে কেন একে অপরের প্রয়োজনে লাভের হিসাব কষতে হবে, সেই প্রশ্নটি আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশে যেখানে রমজান উপলক্ষে দাম কমানোর হিড়িক পড়ে, সেখানে আমাদের দেশে ঘটে তার উল্টোটা। এই বৈপরীত্য আমাদের নৈতিক স্খলনেরই বহিঃপ্রকাশ। আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধ কি তবে শুধু মসজিদের কাতারেই সীমাবদ্ধ থাকবে? বাজারের ব্যাগে যখন টান পড়ে, তখন সেই ভ্রাতৃত্বের বুলি বড্ড ফাঁপা শোনায়।

এই সংকটময় সময়েই আমাদের মানবিক হয়ে ওঠার শ্রেষ্ঠ সুযোগ। যারা সামর্থ্যবান, যাদের ইফতারের টেবিলে রাজকীয় আয়োজন থাকে, তাদের প্রতি একটি বিনীত আবেদন আসুন আমরা আমাদের প্রাচুর্য ভাগ করে নিই।

প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন যদি আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী আমাদের চারপাশের অসহায় বা নিম্নবিত্ত মানুষের মুখে ইফতার তুলে দিতে পারি, তবেই রমজানের প্রকৃত শিক্ষা সার্থক হবে। একটি হাসি বা সামান্য কুশল জিজ্ঞাসার সঙ্গে এক প্লেট ইফতারি যে উষ্ণতা ছড়াবে, তা বাজারের দরের চেয়ে অনেক বেশি দামি। রমজান শুধু পেট ভরানোর মাস নয়, এটি মন ভরানোর এবং অন্যের বোঝা হালকা করার মাস। লেবু বা খেজুরের দাম সিন্ডিকেটের কবলে পড়লেও আমাদের হৃদয় যেন সংকীর্ণ না হয়। সত্যিকারের ইফতার শুধু দামি খাবারে নয়, বরং ভালোবাসা, সংযম আর ত্যাগের মহিমায় সম্পন্ন হয়। এই রমজানে আমরা যদি একে অপরের পাশে দাঁড়াই, তবেই বাজারের আগুনের মধ্যেও এক টুকরো শান্তির পরশ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।

রাকিবুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়