মানব কল্যাণে ইসলামি অর্থব্যবস্থার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামি অর্থনীতি হলো কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার আলোকে পরিচালিত একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা। যা মানুষের নৈতিকতা ও সামাজিক কল্যাণকে প্রাধান্য দেয় এবং পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণ নিশ্চিত করে। ইসলামী অর্থব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ইসলামী শরীয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। কোরআন ও হাদীস এর মূল উৎস। এটি হালাল-হারাম মেনে চলে, জাকাত-সাদকার মাধ্যমে সম্পদ পুনর্বণ্টন করে এবং সুদ ও জুয়াকে নিষিদ্ধ করে। এককথায়, যে অর্থব্যবস্থা ইসলামের নিয়মনীতির (কোরআন-সুন্নাহ) আলোকে পরিচালিত হয়, তাকে ইসলামি অর্থব্যবস্থা বলে। ইসলামি অর্থনীতি বর্তমান বিশ্বের একটি জনপ্রিয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। অমুসলিম দেশে ও এ ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছে। এতে মানুষের সব বিষয়ে সমাধান রয়েছে। এমনকি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ও ইসলামি অর্থনীতি একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাধান দিয়েছেন। সমাজ বিজ্ঞানী ইবনে খালদুন বলেন, ‘ইসলামি অর্থনীতি হলো জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিজ্ঞান’। মহান আল্লাহর নীতিপদ্ধতি অনুসরণে সৃষ্টির লালন-পালনের যাবতীয় জাগতিক সম্পদের সামগ্রিক কল্যাণধর্মী ব্যবস্থাপনাই ইসলামি অর্থনীতি। ইসলামি অর্থনীতির মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে সুদমুক্ত লেনদেন, জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি এবং লাভণ্ডক্ষতির ভিত্তিতে বিনিয়োগ। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন’। (সূরা : বাকারা ২৭৫)।

ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যবসাকে যেভাবে হালাল করা হয়েছে ঠিক তেমনি অবৈধ পণ্যের ব্যবসা ও বিনিয়োগকে হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসলামি অর্থনীতিতে শ্রমবিহীন শোষণমূলক আয়ের পথ যেমন- মদ, জুয়া, সুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম। ইসলামি অর্থনীতির মূল লক্ষ হচ্ছে আর্থ সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। যেন ধন-সম্পদ শুধুমাত্র বিত্তবানদের মধ্য পুঞ্জীভূত না হয় (সূরা হাশর-০৭)। প্রচলিত পুঁজিতান্ত্রিক সুদভিত্তিক অর্থনীতিতে কোনো নৈতিক কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা বা সামজিক দায়বদ্ধতা নেই। ফলে সুদভিত্তিক লেনদেনকে অবলম্বন করে ব্যবসায়িরা একচেটিয়া পুঁজির মালিক হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ জনগণ শোষণ নিষ্পেষণের স্বীকার হচ্ছে। সুদভিত্তিক অর্থনীতি আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা, অস্তিরতা ও ভারসাম্য হীনতার জন্ম দিয়ে সমাজকে অশান্ত সাগরের বুকে হাল বিহীন জাহাজের মত বিপন্ন করে তুলেছে। পুঁজির মালিক হয়ে যাচ্ছে একশ্রেণির পুঁজি পতি। গরিব সাধারণ জনগণ দিনের পর দিন নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য ইসলামি অর্থনীতিতে জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে। ধনীদের উপর গরিবের হক হচ্ছে জাকাত। জাকাত হচ্ছে সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিতদের সহায়তা করার জন্য আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ দান করা। সরকারিভাবে দরিদ্র লোকজনের মধ্য সুষ্ঠুভাবে জাকাত বণ্টন করা হলে দেশের মধ্য অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়ে যাবে। জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালু হলে দেশের মধ্য গরিব আর ধনীদের ব্যবধান দূর হয়ে যাবে। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সম্পদের মূল মালিকানা আল্লাহতায়ালার। ব্যক্তি মালিক নয়, বরং আল্লাহর পক্ষে নিয়োজিত তত্ত্বাবধায়ক, সংরক্ষক, প্রতিনিধি। এ অর্থ ব্যবস্থায় ব্যক্তি- মালিকানা আছে, তবে তা পুঁজিবাদের মতো অবাধ এবং স্বেচ্ছাচারী নয়। আবার সমাজবাদের মতো সামষ্টিক মালিকানাও নয়। ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় সম্পদের সুষম ও ভারসম্যপূর্ণ বণ্টননীতি অনুঃসৃত হয়। এখানে কেউ যেমন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে পারে না, তেমনি কারও পক্ষে নিঃস্ব থাকাও সম্ভব না। এ ব্যবস্থায় ধনীর সম্পদে গরিবের অধিকার দেওয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তাদের (ধনীদের) সম্পদের ওপর গরিব বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে’ (সূরা জারিয়াহ, ১৯)। ইসলামী অর্থব্যবস্থা জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। এখানে যে মুসলিম ব্যক্তির কাছে তার প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পর সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা কিংবা এর সমপরিমাণ অর্থ পূর্ণ এক বছর অতিরিক্তি থাকে তাকে ২.৫% হারে জাকাত আদায় করেতে হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা সালাত কায়েম কর এবং জাকাত আদায় কর, (সূরা বাকারাহ, ৮৩)। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমস্ত লেনদেন সুদমুক্ত। এ ব্যবস্থায় কোন ক্ষেত্রেই সুদের লেনদেন হালাল রাখা হয়নি। সুদ নিষিদ্ধ করে শোষণের পথ বন্ধ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন- আর আল্লাহতায়ালা ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন, (সূরা বাকারাহ-২৭৫)।

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সুদের প্রচলন নেই। রাসূল (সা.) সুদ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য আল্লাহর অভিসম্পাত কামনা করেছেন। কোরআনের চারটি সূরায় ও ১২টি আয়াতে আল্লাহতায়ালা সরাসরি সুদ পরিহার করার আদেশ দেওয়া হয়। সুদের প্রথম আয়াতে বলা হয়, ‘মানুষের ধন সম্পদে তোমাদের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এই আশায় যা কিছু তোমরা সুদে দিয়ে থাক। আল্লাহর কাছে তা বর্ধিত হয় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যা কিছু তোমরা জাকাতরূপে দিয়ে থাক তাই বৃদ্ধি পায় এবং এরূপ লোকেরাই বহুগুনে সম্পদপ্রাপ্ত’।-(সূরা:রুম ৩৯)। সুদের তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ তুমরা সুদ খেয়ো না চক্রবৃদ্ধিহারে, তুমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পার’।-(সূরা আল ইমরান ১৩০) সুদের চতুর্থ আয়াতে আল্লাহতায়ালা সুদ গ্রহণের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বলেন,’ যারা সুদ খায় তারা ওই ব্যক্তির ন্যায় যাকে শয়তান স্পর্শ করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। এই অবস্থা তাদের এ জন্য যে তারা বলে বেচাকেনা তো সুদের মত। অথচ বেচাকেনাকে বৈধ করেছেন, আর সুদকে হারাম করেছেন। যার কাছে তার পালন কর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে নিভৃত্ত হয়েছে, আর তার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে সোপর্দ। কিন্তু যারা আবার সুদ নেবে তারাই দোজখবাসী, তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে।- (সূরা-আল বাকারা২৭৫)। সুদ গ্রহণ আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে যুদ্ধ করার শামিল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তার পর যদি তুমরা পরিত্যাগ না কর, তাহলে আল্লাহ ও তার রাসূলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও’। (সূরা : বাকারা. ২৭৯)।

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় যা খুশি উৎপাদন করা যায় না, আবার যেভাবে খুশি উপার্জন ও খরচ করা যায় না। জনস্বাস্থ্য ও স্বাথের্র জন্য হুমকি এমন সব কিছুর উৎপাদন ইসলামে নিষিদ্ধ। এ ব্যবস্থায় আল্লাহতায়ালা হারাম করেছেন এমন কোনো কিছুর উৎপাদন বৈধ নয়। উপার্জনের ক্ষেত্রেও হালাল উপার্জন বাধ্যতামূলক। রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘হালাল উপার্জন করা ফরজের চেয়েও ফরজ ‘(বায়হাকী: ৮৪৮২)। এজন্য লাভজনক মনে হলেও ইসলামী অর্থব্যবস্থায় মাদক দ্রব্য উৎপাদনের সুযোগ নেই। সুদ, ঘুষ, চুরি বা সম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমেও এ ব্যবস্থায় উপার্জন নিষিদ্ধ। বিশ্ব অর্থনীতিতে যেদিন হতে সুদের লেনদেন চালু হয়েছে, সেদিন থেকে অর্থনৈতিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ, ধনী-গরিবের ব্যবধান, অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মোদ্দাকথা, আজকের এ অশান্ত পৃথিবীতে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে মানুষের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা চালু করতে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধনে ইসলামী অর্থব্যবস্থার বিকল্প নেই।

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

লেখক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট