অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি হচ্ছে জ্বালানি খাতের উন্নয়ন

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের আর্থিক খাতের উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি হচ্ছে জ্বালানি খাতে উন্নতি। যে দেশ জ্বালানি খাতে যত বেশি উন্নতি লাভ করেছে, সে দেশ আর্থিকভাবে তত বেশি সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। জ্বালানি খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বর্তমান দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এ খাতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঘাটতি। এই ঘাটতি কীভাবে মেটানো হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা বিগত সরকারের তরফ থেকে নেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র আমদানি নির্ভরতার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করা হয়েছে। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনার কোনো চেষ্টা সরকারের তরফ থেকে নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে তৈল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি বিরাজমান। জ্বালানি বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর জন্য বেসরকারিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে বাড়ায় চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো কীভাবে চলবে, কয়লা ও গ্যাসের জোগান কোত্থেকে আসবে, বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি কীভাবে সমন্বয় করা হবে সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। যার ফলে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়েছে। গত তিন বছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। নানা অনিয়ম দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে গত অর্থবছরে এই খাতে ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৮ হাজার কোটি টাকা, এরপরও বিপিডিবির নিট লোকসান ১৭ হাজার কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করতে প্রয়োজন শিল্প-কলকারখানায় জ্বালানির চাহিদা পূরণ করা। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা একান্ত জরুরি। জ্বালানি খাতের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে তৈল, গ্যাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জ্বালানির সংকট ও চাহিদা মোকাবিলা করা। শুধুমাত্র কয়েকটা সড়ক, সেতু, মেট্রোরেল, ট্যানেল তৈরি করাকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলা যায় না। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খাতে উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং বড় বড় প্রকল্পে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট নিরসনে বিগত কোনো সরকারই বৃহৎ ও দৃশ্যমান কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন না করে শুধুমাত্র বিদেশ থেকে আমদানির উপর জোরদার করেছে। অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করে তৈল গ্যাস আমদানি করে যেনতেনভাবে দেশের জ্বালানি সংকট নিবারণ করেছে। জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কোনো পরিকল্পনা হাতে নেয়নি।

বিদ্যুৎ

কয়েক যুগ ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য বেসরকারিভাবে যে কেন্দ্রগুলো চালু করা হয়েছে তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল এবং প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক বেশি। বিগত সরকার ভাড়ায় চালিত বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কুইকরেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। শুধুমাত্র বেসরকারি আওয়ামী কোম্পানিকে ফায়দা দিতে এবং মন্ত্রীরা ঐ কোম্পানি থেকে ফায়দা গ্রহণ করতে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির চুক্তি করা হয়েছে। উক্ত গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করতে সরকারকে ইউনিট প্রতি অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়েছে। অধিকাংশ সময় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারার দরুণ গরমে তীব্র লোডশেডিংয়ের জ্বালা সইতে হয়েছে। বিগত ১৬ বছরে বিদ্যুৎ খাতে পুকুর চুরি হয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ তৈরি না করে অলস বসিয়ে রেখে বছরের পর বছর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে। গত ১৬ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। তৎকালীন সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে গৌতম আদানির সঙ্গে করা হয় বিদ্যুৎ ক্রয়ের অসম চুক্তি। যে চুক্তি অনুযায়ী আদানি গ্রুপ থেকে কোনো বিদ্যুৎ না কিনলে ও প্রতিমাসে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ৪৫০ কোটি টাকা প্রদান করতে হচ্ছে। শুধুমাত্র গত দুই অর্থবছরে বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ আদানির বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২৪ হাজার ৮১ কৌটি টাকা। আদানির সঙ্গে গৃহীত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির ফলে বছরে ক্ষতি ১৫ হাজার কোটি টাকা। আদানির বিদ্যুতের দাম বাংলাদেশের অন্যান্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র এমনকি ভারতের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি। অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত বেসরকারি বিদ্যুৎ প্রকল্পই এখন সরকারের গলার কাঁটা। বিগত সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ১৬ বছরে ৯ বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করলেও গ্রাহককে সময়মত পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারেনি।

জ্বালানি গ্যাস

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জ্বালানি গ্যাস। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা জটিলতায় গ্যাস উৎপাদনে আমরা অনেক পিছিয়ে।

এ দেশে শিল্পকারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাব রয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে শিল্প কলকারখানার উৎপাদন প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারনে বহু শিল্প কারখানা উৎপাদন করতে না পেরে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বিগত সরকারগুলো জোড়াতালি দিয়ে সংকট মেটানোর উদ্যোগ নিলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি, অধিকন্তু সংকটের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, যে অল্প পরিমাণ গ্যাস শিল্পখাতে সরবরাহ করা হয়েছে তা অতিরিক্ত দাম দিয়ে সরকার থেকে কিনতে হচ্ছে। বিগত সরকারের নির্বাহী আদেশে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম ২০০ গুণ বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন থেকে জানা যায় বৃহৎ শিল্পে ব্যবহৃত প্রতি গণমিটার গ্যাসের দাম ছিল ১১ টাকা ৯৮ পয়সা এ থেকে ১৫০.৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে। জ্বালানি গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে শিল্প উদ্যোক্তারা মরার উপর খারার ঘা হিসেবে তুলনা করেছেন। অতিরিক্ত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বহু শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এমনিতেই ব্যবসায়ীরা সংকটের মধ্য আছে, তার উপর জ্বালানি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের জন্য সময়টি বেশ কঠিন ও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে।

২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে কোনো গ্যাস আমদানি করতে হয়নি, কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে ঘাটতি পূরণে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। বিগত ৮ বছরে পেট্রোবাংলা এক লাখ কোটি টাকা খরচ করেও লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নানাবিধ সমস্যার ঘেরাটোপে জ্বালানি খাতের উন্নয়ন তো দূরের কথা, উঠে দাঁড়ানো ক্ষমতাও যেন হারিয়ে ফেলছে। মোদ্দাকথা, জ্বালানি খাতে আমরা আমদানি নির্ভর হয়ে পড়েছি। বিগত সরকার দেশের সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবমুখী কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এতে সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করছে। ঘাততি পূরণে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে প্রত্যেক সরকার। অথচ আমাদের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য কারণে সরকার তা উত্তোলন করার উদ্যোগ নিতে পারিনি। অথচ প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার বঙ্গোপসাগর থেকে তৈল ও প্রাকৃতিক জ্বালানি গ্যাস উৎপাদন করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে।

জ্বালানি তৈল

জ্বালানির নিরাপত্তা যে কোনো দেশের স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতার নিরাপত্তার সর্বোচ্চ পরোক্ষ নিয়ামক এবং সবল অর্থনীতির প্রধান নিশ্চায়ক। জ্বালানি নিরাপত্তা অর্থনীতির জন্য প্রধান নিয়ামক হলেও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট বিরাজমান। এ দেশের জ্বালানি তৈল সম্পূর্ণ আমদানির উপর নির্ভরশীল। দেশে প্রতিবছর জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৫ লাখ টন। এর মধ্য ৭৩ শতাংশ ডিজেল ও অকটেনের পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম একেক সময় একেক রকম। বিগত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করলেও দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে বার বার তেলের দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট খালি করা হয়েছে। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও আমাদের দেশে ৫১.৬৮% পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছিল তৎকালীন সরকার। সেই সময় একলাফে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিন তেল ৮০ টাকা থেকে ১১৪ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে অকটেনের দাম লিটার প্রতি ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা বৃদ্ধি (বৃদ্ধির হার- ৫১.৬৮%) এবং পেট্রোল লিটারে ৪৪ টাকা বৃদ্ধি করে ৮৬ টাকা থেকে ১৩০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। (বৃদ্ধির হার- ৫১.১৬%) বিগত সরকার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অযুহাতে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বার বার বাড়িয়েছে। বস্তুত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বাড়লেও পরবর্তী ৪ মাস পর জ্বালানি তেলের দাম অর্ধেক কমে যায়। বর্তমানে প্রতি ডলার ১২০ টাকা হিসাব করে জ্বালানি তেলের ক্রয় মূল্য ৬০ টাকা হলে বাকি ৫০-৭০ টাকা কর-শুল্ক বাবদ জনগণের কাছ থেকে কেটে নিয়েছে। জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কলকারখানা বন্ধ, উৎপাদনে ভাটা, পরিবহন বাড়া বৃদ্ধি, কৃষিকাজ ব্যাহত এবং জনজীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তৎকালীন সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে জ্বালানি তেলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিপিসির কর্মকর্তারা দাবি করেন, বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে কোনো ভর্তুকি দিতে হয় না বরং বিপিসি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। বিপিসির তথ্য মতে, ২০১৫ সাল হতে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৮ বছর জ্বালানি তেল বিক্রি করে সরকার ৫০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা আয় করেছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মূলত আমদানিনির্ভরতা, প্রশাসনিক দুর্নীতি, ডলার সংকট, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস, চড়া দামে এলএনজি আমদানি, অর্থের অভাব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে এ সংকট গভীর থেকে গভীর হচ্ছে।

এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, দুর্নীতি মুক্ত প্রশাসন, বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং পিডিবির সংস্কার একান্ত প্রয়োজন।

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট