বৈশ্বিক এনার্কির রাজনীতিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা
হুমায়ুন আহমেদ নাইম
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে নৈরাজ্যের যুগ চলছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান উপায়ে তুলনামূলকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে সামরিক কিংবা নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। রাজনীতিতে সাধারনত নৈরাজ্য বলতে একটি রাষ্ট্রে সরকার বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতিকে বুঝায়। তেমনি বিশ্ব রাজনীতিতে কোনো একক হেজিমনির অভাব; যা বিশ্ব রাজনীতিকে অস্থির করে তুলছে, দেশে দেশে গৃহযুদ্ধের সৃষ্টি করছে।
?তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিকে প্রায়ই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে এশিয়ার দুর্বল রাষ্ট্র হওয়ায় তার নিরাপত্তার কৌশল অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর থেকে ভিন্ন হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক দেশ অন্য দেশে আগ্রাসন চালায় তার জাতীয় শক্তির মাধ্যমে। জাতীয় শক্তি বলতে বুঝায় একটি রাষ্ট্র নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ বা উদ্দেশ পূরণ করার জন্য অন্য রাষ্ট্রকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পারে। তাত্ত্বিকদের মতে জাতীয় স্বার্থ অনেক গুলো উপাদান রয়েছে। যেমন- সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক শক্তি, মনস্তাত্ত্বিক শক্তি ও বিধ্বংসী অস্ত্র। মূলত এ উপাদানগুলোর মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে থাকে। প্রথমত, সামরিকভাবে চেষ্টা চালায়, কিন্তু তাতে কাজ না হলে অর্থনৈতিক ভাবে বিভিন্ন বিধি-নিষেধ দিতে থাকে, তাতেও যদি প্রভাবিত করতে না পারে তাহলে মনস্তাত্ত্বিকভাবে (কৌশলী নীতি, মিডিয়া, ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ইত্যাদি) প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, সর্বশেষ না হলে বিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করে থাকে। এছাড়া আধুনিক সময়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জনসংখ্যা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সফট পাওয়ারও জাতীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে সামরিক শক্তির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৭তম। আবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৫০টি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। সে হিসাবে বাংলাদেশ দুর্বল একটি দেশ।
কিন্তু তার ভৌগোলিক বিবেচনায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্যান্যদেশের মতো হবে না। কারণ তার তিন দিকেই ভারত এবং এক দিকে মিয়ানমার ও বঙ্গোপসাগর। যেহেতু ভারত এশিয়ার পরাশক্তি এবং বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী, সে হিসেবে ভারত বাংলাদেশের প্রত্যেকটা বিষয়েই সহজেই হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ভারতসহ অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্র গুলোর প্রভাব কমাতে আমরা Erling Bjol Gi Pilot Fish Behaviour তত্ত্বটি বাংলাদেশের জন্য যুগোপযোগী একটা তত্ত্ব। এখানে তাত্ত্বিক বলার চেষ্টা করেছেন, তুমি হাঙ্গরের পাশাপাশি থাকো কিন্তু এমনভাবে থাকো যাতে হাঙ্গর তোমাকে খেতে না পারে। এ তত্ত্ব অনুযায়ী তুলনামূলক দূর্বল রাষ্ট্রগুলো এমনভাবে তাদের কূটনীতি পরিচালনা করবে যেন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশ সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে তেমন শক্তিশালী না এমনকি বিধ্বংসী কোনো অস্ত্রও নেই, তাই সাইকোলজিক্যাল ফ্যাক্টরের বা সফট পাওয়ারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য করবে। কাতার সামরিক দিক দিয়ে খুব শক্তিশালী না হলেও তাদের মিডিয়া আল জাজিরার মাধ্যমে বিশ্ব শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য দেশকে প্রভাবিত করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতে পারে।
হুমায়ুন আহমেদ নাইম
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
