লুটপাটের ছায়ায় সরকারি হাসপাতাল
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতাল- এই শব্দযুগল একসময় ছিল ভরসার প্রতীক। যেখানে দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, প্রান্তিক মানুষের কাছে এটি শেষ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেখানে আজ নানা অভিযোগের পাহাড়। ‘ফ্রি চিকিৎসা’ কথাটি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে অনেক রোগীকে ওষুধ, টেস্ট, এমনকি বেড পাওয়ার জন্যও বাড়তি খরচ গুনতে হয়। এই বাস্তবতা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর অসুখের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে- সেই ভরসার জায়গাটি কি ধীরে ধীরে লুটপাট, দালালচক্র ও অব্যবস্থাপনার আখড়ায় পরিণত হচ্ছে না?
রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন হাজারো রোগী এখানে আসেন জীবনের আশায়। কিন্তু অভিযোগ আছে- জরুরি বিভাগে বেড পেতে দালালের শরণাপন্ন হতে হয়, বিনামূল্যের ওষুধ স্টকে নেই বলে বাইরে কিনতে বলা হয়, পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হয়। এমনকি অপারেশনের তারিখ এগিয়ে দিতে ‘বিশেষ যোগাযোগ’-এর প্রয়োজন হয়? এমন কথাও শোনা যায়। জরুরি বিভাগে অস্বাভাবিক ভিড়, চিকিৎসকের স্বল্পতা, আর অব্যবস্থাপনার সুযোগে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য অর্থনীতি।
একই চিত্র দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও দেখা যায়। লাখো মানুষের চিকিৎসার কেন্দ্র হলেও এখানে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, বেড সংকট ও টেস্ট বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে রোগীর স্বজনরা প্রায়ই বলে?ন- সরকারি হাসপাতালে ঢুকলেই একদল দালাল ঘিরে ধরে, ভয় দেখায়, বাইরে নিয়ে যেতে চায় এমনকি ওষুধ চুরি ও সরঞ্জাম গায়েবের অভিযোগ ও উঠে এসেছে।
উত্তরাঞ্চলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম, ওষুধ চুরি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার খবর সামনে এসেছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক রোগী চিকিৎসকের দেখা পান না। ফলে হতাশা বাড়ে, আর সেই হতাশার ফাঁকেই জন্ম নেয় অনৈতিক লেনদেন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ দালালচক্র ও বাইরের টেস্ট নির্ভরতার অভিযোগ নতুন নয়।
সরকারি ল্যাব থাকা সত্ত্বেও রোগীকে বলা হয়, ‘এখানে হবে না, বাইরে করান।’
দক্ষিণাঞ্চলের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও অতিরিক্ত রোগী, ওষুধ সংকট ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে একাধিকবার। এগুলো শুধু কয়েকটি নামমাত্র উদাহরণ। বাস্তবতা হলো- জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রায় সর্বত্র একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি। কোথাও ডাক্তার নেই, কোথাও নার্সের সংকট, কোথাও যন্ত্রপাতি অচল, কোথাও ওষুধ গায়েব। আর এই বিশৃঙ্খল পরিবেশেই গড়ে ওঠে একটি অদৃশ্য অর্থনীতি- যার কেন্দ্রে থাকে অসহায় রোগী।
স্বাস্থ্য খাতে প্রতিবছর বাজেট বাড়ছে, নতুন ভবন হচ্ছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- সেবার মান কি সেই অনুপাতে বাড়ছে? অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা সংস্কার কতটা হয়েছে? একটি হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ সহজ; কিন্তু সেই ভবনের ভেতরের অনিয়ম দূর করা কঠিন। লুটপাটের এই সংস্কৃতির পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, জবাবদিহিতার অভাব। অভিযোগ উঠলেও অনেক সময় তা কার্যকর তদন্তে রূপ নেয় না। দ্বিতীয়ত, দালালচক্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। হাসপাতালের গেট থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত তাদের সক্রিয় উপস্থিতি রোগীকে বিভ্রান্ত করে। তৃতীয়ত, সরবরাহ ব্যবস্থায় দুর্বলতা। ওষুধ ও সরঞ্জাম বরাদ্দ থাকলেও সঠিক মনিটরিং না থাকায় তা রোগীর হাতে পৌঁছায় না। চতুর্থত, রোগীর তুলনায় জনবলের ঘাটতি যা বিশৃঙ্খলা বাড়ায়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। একজন দিনমজুর যখন শেষ সম্বল বিক্রি করে হাসপাতালে আসে, তখন সে শুধু চিকিৎসা চায়। কিন্তু যদি তাকে ঘুষ দিতে হয়, বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়, বা অপমান সহ্য করতে হয়- তবে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সামাজিক অবিচার।
এখানে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা। নিয়মিত অডিট, হঠাৎ পরিদর্শন, ডিজিটাল মনিটরিং ও ওষুধ সরবরাহে অনলাইন ট্র্যাকিং চালু করতে হবে। কোন হাসপাতালে কত ওষুধ গেছে এবং কত বিতরণ হয়েছে- এই তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে স্বচ্ছতা বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, দালালমুক্ত হাসপাতাল নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে হাসপাতাল এলাকায় স্থায়ী নজরদারি থাকতে পারে। প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি। তৃতীয়ত, চিকিৎসক ও নার্সদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত চাপ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাহীনতা অনেক সময় সেবার মান কমিয়ে দেয়। নতুন নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। চতুর্থত, একটি কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে দৃশ্যমান হেল্পডেস্ক, হটলাইন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থাকতে হবে, যেখানে রোগী বা স্বজন অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার নিষ্পত্তি হবে।
স্বাস্থ্যখাত কোনো ব্যবসা নয়- এটি মানবিকতার ক্ষেত্র। এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত একটি জীবনের সঙ্গে যুক্ত। একটি ইনজেকশন, একটি স্যালাইন, একটি অপারেশন - সবকিছুই কারও বেঁচে থাকার গল্প। তাই এই খাতে লুটপাট মানে শুধু অর্থ আত্মসাৎ নয়; এটি জীবনের সঙ্গে প্রতারণা।
একটি রাষ্ট্রের মানবিকতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার হাসপাতালের চিত্র দেখে। যদি সরকারি হাসপাতালগুলোতেই অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ ভেসে ওঠে, তবে তা জাতির জন্য লজ্জার। উন্নয়নের প্রকৃত মানে শুধু সেতু, রাস্তা বা ভবন নয়; উন্নয়নের মানে মানুষের আস্থা।
আজ সময় এসেছে স্বাস্থ্যখাতে একটি গভীর সংস্কারের। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক কঠোরতা ও সামাজিক নজরদারি- এই তিনের সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সরকারি হাসপাতালকে বাঁচানো মানে দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষকে বাঁচানো। একজন অসহায় রোগীর চোখের জল যেন আর কারও আয়ের উৎস না হয় এই নৈতিক অঙ্গীকার থেকেই শুরু হোক পরিবর্তন।
সুমাইয়া সিরাজ সিমি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
