নিত্যপণ্যের দামে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস

হেনা শিকদার

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রমজান মানেই সংযম, সহমর্মিতা আর আত্মশুদ্ধির মাস। কিন্তু আমাদের দেশে বছরের এই একটি মাস এলেই যেন একদল অসাধু ব্যবসায়ীর ভেতরে থাকা মুনাফালোভী দানবটি জেগে ওঠে। পবিত্রতার এই আবহে সাধারণ মানুষের ইবাদতে মগ্ন হওয়ার কথা থাকলেও, তাদের দিনের বড় একটা অংশ ব্যয় হচ্ছে বাজারের ফর্দ কাটছাঁট করতে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতে। আজ বাজারের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে যখন কোনো মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষ থলি হাতে দাঁড়ান, তখন তার চোখেমুখে তৃপ্তির বদলে এক ধরণের আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। নিত্যপণ্যের এই আকাশচুম্বী দাম এখন শুধু পকেটের ওপর চাপ নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমানের ওপর এক চরম অবমাননা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমান রমজানের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। ইফতারের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছোলা, চিনি, তেল কিংবা খেজুরের দাম যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। যে সাধারণ মানুষটি সারাদিন রোজা থেকে সন্ধ্যায় একটু ভালোভাবে ইফতার করার স্বপ্ন দেখেন, তাকে এখন ভাবতে হচ্ছে বেগুনি কিংবা পিয়াজুর বদলে অন্য কিছু দিয়ে পেট ভরানো যায় কি না। খেজুর এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক বিলাসী ফল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত রমজানের মতো এবারও বেড়েছে লেবুর দাম। অথচ বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার দোহাই দিয়ে প্রতি বছর যে খেলা শুরু হয়, তার অন্তরালে থাকে এদেশীয় এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের কালো হাত এতটাই লম্বা যে, সরকারের নানামুখী হুঁশিয়ারি কিংবা জেল-জরিমানাও তাদের এই অশুভ উৎসব থামাতে পারছে না। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে গুদামে পণ্য মজুদ করে রাখে, আর যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে, তখন বিন্দু বিন্দু করে পণ্য বাজারে ছেড়ে চড়া দামে লুটে নেয় কোটি কোটি টাকা।

সিন্ডিকেটের এই কালো হাতের নিয়ন্ত্রণ শুধু আমদানিকৃত পণ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে সব জায়গায়। মাঠপর্যায়ে যে কৃষক হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিয়ে সবজি বা ফসল উৎপাদন করছেন, তিনি তার ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। অথচ হাতবদল হয়ে সেই পণ্য যখন শহরের বাজারে পৌঁছায়, তখন তার দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই যে মাঝখানের অদৃশ্য কারসাজি, যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা কোনো পরিশ্রম ছাড়াই ফুলেফেঁপে উঠছে, সেখানে পিষ্ট হচ্ছে দুই প্রান্তের মানুষ- উৎপাদনকারী কৃষক এবং ভোক্তা সাধারণ। রাষ্ট্র যখন বাজার মনিটরিংয়ের কথা বলে, তখন কিছু খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করা হয় ঠিকই, কিন্তু মূল হোতারা সব সময় থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই দায়হীনতার সংস্কৃতিই সিন্ডিকেটকে আরও সাহসী করে তুলছে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্রটি দেখা যায় সাদা পোশাকের মধ্যবিত্তের মধ্যে। তারা না পারেন টিসিবির লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে, না পারেন কারও কাছে হাত পাততে। তাদের দীর্ঘশ্বাস কোনো খবরের কাগজে বড় শিরোনাম হয় না, কিন্তু নিভৃতে প্রতিটি পরিবারে হাহাকার তৈরি করে। সঞ্চয় ভেঙে খেয়ে ফেলা কিংবা চিকিৎসা-শিক্ষার খরচ কাটছাঁট করে দুবেলা খাবারের সংস্থান করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রমজানে যে সংযমের শিক্ষা আমাদের নেওয়ার কথা ছিল, তার বদলে আমরা দেখছি এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর চরম অসংযম ও লোলুপতা। বাজার ব্যবস্থাপনার এই নড়বড়ে পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করছে। এই নরক যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে হলে শুধু মৌখিক হুঁশিয়ারি যথেষ্ট নয়। সরকারকে কঠোর হাতে সিন্ডিকেটের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে। আমদানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা, টিসিবির পরিধি বাড়ানো এবং সত্যিকারের মুনাফালোভী বড় মাছেদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। বাজারের এই আগুনের আঁচ যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘশ্বাস একদিন বড় কোনো সামাজিক অস্থিরতার রূপ নিতে পারে। একটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি তখনই সার্থক হয়, যখন সাধারণ মানুষ শান্তিতে দু’মুঠো খেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। বাজারের এই অনিশ্চয়তা দূর করে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফেরানোই হোক এখনকার মূল অগ্রাধিকার।

হেনা শিকদার

দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়