অমর একুশে : আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে চেতনার জাগরণ

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাঙালির ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়, বরং এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের অগ্নিপরীক্ষা। ১৯৫২ সালের সেই ফাল্গুনি দিনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল তরুণ প্রাণের রক্তে, যার মূলে ছিল মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার অদম্য বাসনা। আজ সাত দশকেরও বেশি সময় পার করে একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। কিন্তু প্রশ্ন জাগে- একুশে কী শুধু পঞ্জিকার একটি লাল তারিখ কিংবা একদিনের পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ আর প্রভাতফেরির আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে? একুশের মূল চেতনা কী আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের আচরণ, মনন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রতিফলিত হচ্ছে?

প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আসে এবং আমরা অত্যন্ত আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে শহিদ মিনার অভিমুখে যাত্রা করি। সাদা-কালো পোশাক, নগ্ন পদযাত্রা, আর গান- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। কিন্তু দিবসটি অতিবাহিত হওয়ার পরদিনই আমরা যেন সেই আবেগ আলমারিতে তুলে রাখি। একুশের চেতনা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা, স্বাধিকার এবং নিজের স্বকীয়তাকে উঁচিয়ে ধরা। বর্তমানে এই দিবসটি কেন্দ্র করে যে বিপুল বাণিজ্যিক ও আনুষ্ঠানিক আয়োজন দেখা যায়, তার আড়ালে একুশের মূল দর্শন- অর্থাৎ সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন এবং অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন সমাজ গঠন- অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

একুশের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা করা। অথচ আজ উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা এবং কর্পোরেট সংস্কৃতিতে বাংলার অবস্থান এখনও প্রান্তিক। উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমে বা আধুনিক সন্তানদের মুখে বাংলা বলা যখন হীনম্মন্যতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে একুশের চেতনা এখনও আমাদের মগজে পৌঁছাতে পারেনি। বিজ্ঞাপনের ভাষা, সাইনবোর্ড কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে বিকৃত বাংলার ব্যবহার প্রমাণ করে যে আমরা ভাষাকে শুধু আবেগ দিয়ে দেখি, দায়িত্ব দিয়ে নয়। একুশে ফেব্রুয়ারি যদি শুধু একদিনের জন্য বাংলাকে ভালোবাসার দিন হয়, তবে তা হবে ভাষা শহিদদের আত্মদানের প্রতি চরম অবজ্ঞা।

একুশ মানে মাথা নত না করা। এই চেতনা আমাদের শিখিয়েছিল শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। কিন্তু বর্তমান সময়ে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব, মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ হওয়া এবং সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনা নির্দেশ করে যে আমরা একুশের সেই উদার নৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হচ্ছি। বিশ্বায়নের এই যুগে অন্য ভাষা শেখা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা নিজের ভাষাকে বিসর্জন দিয়ে নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলার প্রতি যে অবহেলা পরিলক্ষিত হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে একটি শিকড়হীন প্রজন্ম তৈরি করছে। একুশকে শুধু গান আর বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না রেখে একে মননশীলতা ও গবেষণার জায়গায় নিয়ে আসা জরুরি।

একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এর অর্থ হলো শুধু বাংলা নয়, পৃথিবীর প্রতিটি ক্ষুদ্র ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা। আমাদের দেশে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে যাদের মাতৃভাষা আজ বিলীন হওয়ার পথে। একুশের চেতনার প্রকৃত বাস্তবায়ন তখনই হবে যখন আমরা নিজের ভাষার পাশাপাশি অন্য সব জাতিসত্তার মাতৃভাষাকেও সমান গুরুত্ব দেব এবং তাদের ভাষা সংরক্ষণে সচেষ্ট হব। শুধু বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলা করাই একুশ নয়, একুশ হলো বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের জয়গান।

একুশ আমাদের প্রাণশক্তি। একে শুধু ২১ ফেব্রুয়ারির সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মধ্যবর্তী কয়েক ঘণ্টার আনুষ্ঠানিকতায় বন্দি রাখলে চলবে না। একুশের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে বছরের ৩৬৫ দিন। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাজে বাংলার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা। মানসম্মত অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে বিশ্বজ্ঞানের সঙ্গে বাংলার সেতুবন্ধন তৈরি করা। প্রজন্মের কাছে একুশের সঠিক ইতিহাস এবং এর অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরা। ভাষার বিকৃতি রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

শহিদ মিনার শুধু ইট-পাথরের স্থাপত্য নয়, এটি আমাদের মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ডকে শক্ত রাখতে হলে আনুষ্ঠানিকতার খোলস ভেঙে একুশের অবিনাশী চেতনাকে ধারণ করতে হবে আমাদের কর্মে, চিন্তায় এবং জাতীয় নীতিতে। তবেই সার্থক হবে ভাষা শহিদদের রক্তদান, তবেই অমর একুশে হবে আমাদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস।