চট্টগ্রাম বন্দর : পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আঞ্চলিক সমীকরণ
এম মহাসিন মিয়া
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত বাংলাদেশ শুধু ভৌগোলিক কারণে নয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কৌশলগত অবস্থানের কারণেও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নজরে রয়েছে। বিশেষত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম আজ শুধু বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর নয়, বরং পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব অর্জন করছে। এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ, সবকিছু এক জটিল সমীকরণে আবদ্ধ হয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ফলে দুই দেশের মধ্যে প্রাথমিক সম্পর্ক ছিল আন্তরিক ও সহযোগিতামূলক, তবে আন্তরিকতা ও সহযোগিতার অন্তরালে ভারত সবসময় কৌশলগতভাবে তার নিজের স্বার্থতে প্রাধান্য দিয়েছে একথা মিথ্যে নয়। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি মৌলিক বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রের সম্পর্ক চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের ভিত্তিতে নয়, বরং স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তার কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, সেই স্বার্থের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বা কতটা সাংঘর্ষিক।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং স্থলবেষ্টিত। এই অঞ্চলের সঙ্গে সমুদ্রপথের সরাসরি সংযোগ না থাকায় বাণিজ্য ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ভারতকে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ের মুখোমুখি হতে হয়। এ বাস্তবতায় চট্টগ্রাম বন্দর ভৌগোলিকভাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য অত্যন্ত নিকটবর্তী ও কার্যকর সমুদ্রপথ। ফলে এ বন্দরকে ঘিরে ভারতের আগ্রহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। এরইমধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি কার্যকর হয়েছে, যা দেখায়, সহযোগিতার পথও খোলা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকগণ মনে করেন, সহযোগিতার আড়ালে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হিসাবও থাকতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতিগত বিরোধ ও সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে।
এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও অবস্থান কৌশলগতভাবে প্রতিক্রিয়াশীল বা স্পর্শ কাতর। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক শক্তি এই অস্থিরতাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের প্রত্যক্ষ প্রমাণ সবসময় স্পষ্ট নয়, তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এমন সম্ভাবনা বা অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের- এ সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ বঙ্গোপসাগরে তার উপস্থিতি শক্তিশালী করেছে। এই অঞ্চল থেকে ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক রুট পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরও ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্ব পাচ্ছে, যা ভারতের ঐতিহাসিক এর সঙ্গে তুলনায় নতুন প্রতিযোগিতার মাত্রা যোগ করেছে।
এখানে একটি বিতর্কিত দিক হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন ও তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য। অতীতে কিছু নেতা মন্তব্য করেছেন যে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। যেমন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এর নাম উল্লেখ করে এমন যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, সিদ্ধান্ত ভিন্ন হলে উত্তর-পূর্ব ভারত একটি সমুদ্রবন্দর পেত। এসব বক্তব্য রাজনৈতিক আবেগ ও ঐতিহাসিক বিতর্কের অংশ হলেও, তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নাজুক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কোনো রাষ্ট্র কি সরাসরি অন্য দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কব্জা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায়? বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি, কূটনৈতিক কাঠামো ও আঞ্চলিক জোটের বাস্তবতায় এমন পদক্ষেপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। বরং অর্থনৈতিক নির্ভরতা, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও কৌশলগত প্রভাব, এই নরম শক্তির মাধ্যমেই অধিকাংশ রাষ্ট্র তাদের প্রভাব বিস্তার করে।
এক্ষেত্রে বিশ্লেষকগণের মতে, বাংলাদেশের জন্য মূল করণীয় হলো অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান, উন্নয়ন সুবিধার সুষম বণ্টন এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের স্বীকৃতি। এসব পদক্ষেপ অস্থিরতার অবকাশ কমাবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা ও বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।
আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা বাস্তবতা, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কূটনৈতিক ভারসাম্যে নিহিত।
তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও বাস্তববাদী নীতিই হতে পারে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কার্যকর পথ। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের সম্পদ, এর ব্যবহার ও উন্নয়ন হবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। চট্টগ্রাম বন্দর ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে যেকোনো আলোচনায় সতর্কতা, ভারসাম্য ও কৌশলগত দূরদৃষ্টি প্রয়োজন। শক্তিশালী ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে অভ্যন্তরীণ ঐক্যই হবে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।
এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা
