স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশি ফলের ভূমিকা
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুজলা-সুফলা ও শস্য-শ্যামলা এই বাংলাদেশে ঋতুভেদে হরেক রকমের ফলের সমারোহ দেখা যায়। আমাদের এই পলিমাটি এতটাই উর্বর যে, এখানে কোনো বীজ পড়লে তা থেকে অনায়াসে ফলবান বৃক্ষ জন্মায়। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কুল, বাতাবি লেবু, আমলকী, কদবেল, জামরুল, আতা, শরিফা, কামরাঙা, গাব, সফেদা ও বেলের মতো অসংখ্য দেশি ফল আমাদের রসনা তৃপ্ত করার পাশাপাশি শরীরের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করে। বর্তমান সময়ে বিদেশি ফলের চাকচিক্য ও বিজ্ঞাপনী প্রচারের আড়ালে আমাদের দেশি ফলগুলো অনেকটা অবহেলিত হলেও, পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে- আমাদের জলবায়ুতে বেড়ে ওঠা মানুষের জন্য দেশি ফলই সবচেয়ে বেশি কার্যকর ও স্বাস্থ্যসম্মত।
দেশি ফলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত পুষ্টিগুণ। আমরা প্রায়ই মনে করি বিদেশি দামি আপেল বা আঙুরে বুঝি সবচেয়ে বেশি ভিটামিন। কিন্তু পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি মাঝারি আকারের দেশি পেয়ারাতে একটি আপেলের চেয়েও আরও বহু বেশি ভিটামিন ‘সি’ থাকে। ঠিক একইভাবে, রক্তস্বল্পতা দূর করতে আমদানিকৃত আঙুরের চেয়ে আমাদের দেশি কালো জাম বা ডুমুর অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। আমলকী হলো ভিটামিন ‘সি’-এর ভান্ডার, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাতাবি লেবু বা বেলের মতো ফলগুলো শুধু তৃষ্ণা মেটায় না, বরং পেটের নানা অসুখ ও হজমপ্রক্রিয়ায় মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া কাঁঠালকে বলা হয় পুষ্টির পাওয়ার হাউজ, যা আমাদের শরীরে শক্তি জোগানোর পাশাপাশি প্রোটিন ও ফাইবারের চাহিদাও মেটায়।
বিদেশি ফলগুলো সাধারণত হাজার হাজার মাইল দূর থেকে জাহাজে বা বিমানে করে আমদানি করা হয়। এগুলোকে পচন থেকে রক্ষা করতে এবং দীর্ঘ সময় সতেজ দেখাতে প্রায়ই বিভিন্ন রাসায়নিক প্রিজারভেটিভ বা মোমের প্রলেপ ব্যবহার করা হয়, যা আমাদের লিভার ও কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। অন্যদিকে, দেশি ফল সাধারণত সরাসরি বাগান থেকে তোলা হয় এবং দ্রুত বাজারে পৌঁছায়। ফলে এগুলোতে রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না বললেই চলে। প্রাকৃতিকভাবে পাকা দেশি ফলের স্বাদ ও ঘ্রাণ যেমন অতুলনীয়, তেমনি এটি শরীরের জন্য শতভাগ নিরাপদ। দেশি ফলের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এর সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্য। বিদেশি ফলগুলো যখন চড়া দামে অভিজাত বাজারে কিনতে হয়, তখন দেশি ফল আমাদের গ্রামগঞ্জের পাড়া-মহল্লায় এমনকি ফুটপাতেও অত্যন্ত সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। সাধারণ আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে সবারই এই ফল কেনার সামর্থ্য থাকে। এছাড়া আমরা যখন বিদেশি ফলের বদলে দেশি ফল কিনি, তখন সেই টাকা সরাসরি আমাদের দেশের প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং কৃষকদের দেশি ফলের বাগান করতে উৎসাহিত করে। ফলে দেশের টাকা দেশেই থাকে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়।
পরিশেষে বলা যায়, সুস্থ ও দীর্ঘজীবী হওয়ার জন্য বিদেশি ফলের মোহে মত্ত না হয়ে আমাদের চিরচেনা দেশি ফলের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। আমাদের হাতের নাগালে পাওয়া এই সস্তা অথচ মহাঔষধি গুণসম্পন্ন ফলগুলো আমাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে অপরিহার্য। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্তত একটি দেশি ফল রাখার অভ্যাস আমাদের প্রত্যেকের গড়ে তোলা উচিত। দেশি ফল খেয়ে আমরা যেমন নিজেরা সুস্থ থাকব, তেমনি আমাদের কৃষি ও অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করতে পারব।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
