প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই নদী শুধু জলের আধার নয়, বরং এটি ছিল এক একটি সমৃদ্ধ জনপদের জীবনীশক্তি। মেসোপটেমিয়া থেকে শুরু করে সিন্ধু নদ কিংবা আমাদের এই পলিবিধৌত গাঙ্গেয় বদ্বীপ- সবখানেই মানুষের বসতি গড়ে ওঠার পেছনে প্রধান কারিগর ছিল নদী। কিন্তু আধুনিক যুগে নদী আর শুধু কৃষিকাজের উৎস বা সহজ যাতায়াত পথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতির এক শক্তিশালী হাতিয়ার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ‘নদী বাণিজ্য’ শব্দবন্ধটি শুনতে যতটা সাধারণ মনে হয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার লড়াই, আধিপত্য বিস্তার এবং অর্থনীতির এক বিশাল জটিল সমীকরণ। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, যে জাতি নদীপথকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, তারাই বাণিজ্যে ও শক্তিতে বিশ্বকে শাসন করেছে। নদী ছিল পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানের বিশ্ব ব্যবস্থায় নদী আর শুধু একটি উন্মুক্ত পথ নয়, বরং এটি সার্বভৌমত্বের এক বড় অংশ। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এখন একটি কৌশলগত অবস্থান। যখন একটি উজানের দেশ কোনো নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে বা বাঁধ নির্মাণ করে, তখন সেটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে ভাটির দেশের ওপর এক ধরণের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ। পানির এই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কোনো রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের ওপর যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়, তাকেই আধুনিক বিশ্লেষকরা ‘হাইড্রো-পলিটিক্স’ বা পানি নীতি বলে অভিহিত করেন। আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশে অভ্যন্তরীণ নদী বাণিজ্য এক সময় অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল। বড় বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা গঞ্জ গড়ে উঠেছিল নদীর কোলঘেঁষে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা আর প্রভাবশালী মহলের ‘কালো হাত’ আজ সেই বাণিজ্যকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নদী দখল এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের মাধ্যমে একদল মানুষ আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে, অথচ রাষ্ট্রের সঠিক তদারকির অভাবে নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে। নদীকে শাসন করার নামে যে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, তা অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল নদীর স্বাভাবিক জীবন বজায় রেখে তাকে বাণিজ্যের উপযোগী করা, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নিয়ন্ত্রণ মানেই হলো একচেটিয়া দখলদারি।
অন্যদিকে, নদীর ওপর রাষ্ট্রীয় আধিপত্য শুধু সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে বড় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চলে নীরব প্রতিযোগিতা। নদীপথের মাধ্যমে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর যে প্রবেশাধিকার, তা কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করে। এই লাইফলাইন যখন রাষ্ট্রীয় দরকষাকষির গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সাধারণ মানুষের স্বার্থ গৌণ হয়ে পড়ে। নদীর সম্পদ যেমন- মৎস্য, খনিজ এবং পরিবহনের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ যদি জনবান্ধব না হয়ে পুঁজিবান্ধব হয়, তবে তা বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নদীকে পুঁজি করে বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যখন পরিবেশের তোয়াক্কা না করে শিল্পায়ন চালায়, তখন রাষ্ট্রকে সেই ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়।
নদী কোনো জড় বস্তু নয় যে তাকে শুধু বাণিজ্যের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই নদী বাণিজ্যের শক্তি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শুধু মুনাফার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। নদীর অধিকার রক্ষা করে, তার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করে যে বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, সেটাই হবে দীর্ঘস্থায়ী ও কল্যাণকর। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, নদীর মৃত্যু মানে শুধু একটি জলপথের বিনাশ নয়, বরং একটি সভ্যতার নিঃশব্দ অবসান। তাই নদী নিয়ন্ত্রণ হোক সংরক্ষণের জন্য, লুণ্ঠনের জন্য নয়।
হেনা শিকদার
দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়