প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ঋতু পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে রাজধানীসহ সারা দেশে মশার উপদ্রব এখন চরমে। নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে মশা এখন শুধু এক বিরক্তিকর পতঙ্গ নয়, বরং একটি বড় ধরনের আতঙ্ক ও জনস্বাস্থ্য সংকটের নাম। সকাল থেকে গভীর রাত- বাসা-বাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা গণপরিবহন, কোথাও মিলছে না নিস্তার। মশার এই অসহনীয় দাপটে জনজীবন যেমন অতিষ্ঠ, তেমনি বাড়ছে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি। সাধারণ মানুষ কয়েল, স্প্রে বা মশারি ব্যবহার করেও এই সংকট থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে মশা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
সাম্প্রতিক সময়ে মশার ঘনত্ব এতটাই বেড়েছে যে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং নিচু জলাশয় সংলগ্ন জনপদগুলোতে মশার আক্রমণ সবচেয়ে বেশি। মশার যন্ত্রণায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না, কর্মজীবী মানুষের বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটছে এবং শিশুরা প্রতিনিয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মশা মারতে ব্যবহৃত কয়েল বা অ্যারোসলের অতিরিক্ত ব্যবহার আবার শ্বাসকষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থাৎ, মশা একদিকে কামড় দিয়ে রোগ ছড়াচ্ছে, অন্যদিকে তা থেকে বাঁচতে গিয়ে মানুষ অন্য স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়ছে।
মশার উপদ্রব মানেই শুধু রক্ত খাওয়া বা চুলকানি নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগ। গত কয়েক বছরে দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আমরা দেখেছি। এডিস মশার পাশাপাশি কিউলেক্স মশার বিস্তারও এখন নিয়ন্ত্রণহীন। জলাশয়গুলো পরিষ্কার না করায় কিউলেক্স মশা বংশবিস্তার করছে দ্রুত গতিতে। বর্ষা আসার আগেই যদি এই প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করা না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়বে।
মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে একদম কাজ করছে না, তা নয়। তবে সেই কাজের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিয়মিত ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটানো বা লার্ভিসাইড প্রয়োগের পদ্ধতিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ‘লোক দেখানো’ বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। ড্রেন পরিষ্কার করা, কচুরিপানা অপসারণ এবং ওষুধ ছিটানোর মধ্যে কোনো সঠিক সময়ভিত্তিক সমন্বয় নেই। দীর্ঘ সময় একই ওষুধ ব্যবহারের ফলে মশা সেই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা (Resistance) তৈরি করে ফেলেছে। মাঠপর্যায়ে মশক নিধন কর্মীরা ঠিকমতো কাজ করছেন কি না, তা দেখার জন্য শক্ত তদারকি ব্যবস্থার অভাব স্পষ্ট।
মশা নিধন শুধু ধোঁয়া ছিটানোর মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। মশা মারার চেয়ে মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা বেশি কার্যকর। শহরের বদ্ধ নর্দমা পরিষ্কার রাখা, ড্রেনগুলোতে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং পরিত্যক্ত জলাশয় ও ঝোপঝাড় নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। মশার প্রজাতি শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী কার্যকর কীটনাশক নির্বাচন করতে হবে। প্রয়োজনে ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে ওষুধের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। জৈবিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ (যেমন- জলাশয়ে গাপ্পি মাছ ছাড়া) আরও ব্যাপকভাবে শুরু করা যেতে পারে। বাড়ির আঙিনা, ছাদ বাগান বা টবে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি যে এডিস মশার প্রজনন কেন্দ্র, তা নিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে। শুধু প্রচার নয়, প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ ও জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা মশার বংশবিস্তারে সহায়তা করে। একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে মশার উপদ্রব অনেকটাই কমে আসবে।
মশার উপদ্রব থেকে মুক্তি পাওয়া কোনো অসম্ভব কাজ নয়, যদি সদিচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনা থাকে। মশা নিধন কার্যক্রম শুধু একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের কাজ হওয়া উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত সারা বছরব্যাপী একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। কর্তৃপক্ষের উচিত দায়সারা গোছের কাজ বাদ দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। আমরা চাই না মশার কামড়ে আর কোনো প্রাণ ঝরে পড়ুক বা কোনো শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ুক। একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য নগরী গড়তে মশা নিয়ন্ত্রণে আপসহীন ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।