ইউএনও বনাম উপজেলা চেয়ারম্যান দ্বন্দ্বের অবসান হোক
এম. আলতাফ মাহমুদ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘদিন ধরেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের মধ্যে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। উপজেলা চেয়ারম্যানদের বক্তব্য, ইউএনওরা প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যানদের না জানিয়ে বা অবহিত না করে প্রশাসনিক কাজ করে যাচ্ছে। এমনকি উন্নয়নমূলক কাজেও ইউএনওদের হস্তক্ষেপ রয়েছে বেশি। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় ইউএনও বনাম উপজেলা চেয়ারমানদের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং উপজেলা চেয়ারম্যান একজন জনপ্রতিনিধি। প্রশাসন ও উন্নয়ন ক্ষেত্রে উভয়ের মতামতের ভিত্তিতে উপজেলার সব কাজকর্ম সম্পাদিত হবে। ২০১১ সালের সংশোধিত উপজেলা পরিষদ আইনে উপজেলাকে প্রশাসনিক একাংশ ঘোষণা করা হয়েছে। আইনটির তৃতীয় তফসিলে ১২টি মন্ত্রণালয়ের উপজেলাভিত্তিক ১৭টি বিভাগকে উপজেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যানদের অনুমোদন নেওয়ার কথা। ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর এ সংক্রান্ত আদেশও জারি করা হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু আইন ও সরকারের আদেশকে অমান্য করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন সময় পরিপত্র জারি করার মধ্য দিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে। সেই পরিপত্র অনুসরণ করে ইউএনওরা উপজেলা চেয়ারম্যানদের বাদ দিয়ে নিজের মতো সব কিছু পরিচালনা করছে। আমলাতান্ত্রিক এ জটিলতায় উপজেলা চেয়ারম্যানরা স্বাধীনভাবে উপজেলার কোনো কাজ করতে পারছে না। উপজেলা চেয়ারম্যানরা উপজেলা পরিষদের সদস্যদের নিয়ে উপজেলার কোনো কাজ করতে পারছে না। এই দ্বন্দ্ব দেশের সব উপজেলায়। কোনো কোনো উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের নামমাত্র দুটি অফিস রয়েছে। প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজ ইউএনওরাই করে যাচ্ছেন। উপজেলা চেয়ারম্যানরা নামমাত্র একটি পদ নিয়ে বসে আছেন। উপজেলা গঠনের পর স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় যে পরিপত্র জারি করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছেÑ উপজেলার উন্নয়নমূলক কাজের প্রধান নির্বাহী থাকবেন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সঙ্গে থাকবেন ইউএনও। প্রশাসনিক কাজে ইউএনও ও উপজেলা চেয়ারম্যান যৌথ পরামর্শে কাজ করবে।
কিন্তু ইউএনওরা নিজের মতো প্রশাসনিক কাজ করছে। সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যানদের কোনো ভূমিকায় রাখা হচ্ছে না। উন্নয়নমূলক কাজে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ভূমিকা থাকলেও প্রধান ভূমিকায় তারা নেই। এজন্যই তারা ক্ষুব্ধ। কোনো কোনো উপজেলা চেয়ারম্যানের মুখে আমি শুনেছি ইউএনওরা তাদের কোনো কাজেই শরিক করেন না। তারা নাকি নামমাত্র উপজেলার চেয়ারম্যান। ইউএনও বনাম উপজেলা চেয়ারম্যানের নীরব দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৬ সালে পরিষদ গঠিত হয়। উপজেলা পরিষদ আইনে বলা হয়, প্রতিটি থানা উপজেলা পরিষদ নামে হবে এবং প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আদালতও হবে। নিজ নিজ উপজেলার লোক নিজ নিজ উপজেলায় প্রতিটি মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি হবে। এরশাদ সরকারের করা উপজেলার বিরোধিতা করে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। উপজেলা পরিষদ বাতিলের আন্দোলন করতে গিয়ে রাজপথে শহীদ হন সেলিম-দেলোয়ার। পরবর্তী সময়ে এরশাদ সরকারের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে উপজেলা আদালত পুনরায় জেলায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে উপজেলা পরিষদ পুনর্গঠিত হয়। উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করে উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবে জনগণের ভোটেÑ এ আইন পাস করা হয়। এরপর দেশের প্রতিটি উপজেলার জনগণের ভোটে একজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বচিত হওয়ার পর উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন, যা এখন প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। গত ২ জানুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের সংগঠন বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশন। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানান। উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দুমকী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হারুন অর রশিদ হাওলাদার বলেন, পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হলে ১৭ জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করবে। সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত ও প্রতিনিধিরা থাকলেও প্রশাসনের কর্মকর্তা ইউএনও সবকিছু উপেক্ষা করে উপজেলা শাষকের দায়িত্ব পালন করছেন। কিছু কর্মকর্তা সাংবিধানিক নির্দেশনা অমান্য করে জনপ্রতিনিধিবিহীন জনপ্রশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা চেয়ারম্যানরা কঠোর হুঁশিয়ারিও দেন এবং বলেন, উপজেলা প্রশাসনের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করা না হলে, তারা আন্দোলন থেকে সরে যাবেন না। গত ৬ জানুয়ারি উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দুমকী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হারুন-অর-রশিদ হাওলাদার হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ থাকার পরও উপজেলার নির্বাহী ক্ষমতা ইউএনওর কাছে থাকা কেন সংবিধানের ৫৯ ধারার সঙ্গে সাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রুলে উপজেলাধীন ১৭টি বিভাগের অধিকাংশ কমিটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানকে উপদেষ্টা করার পরিপত্র কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ ১৬ জনকে জবাব দিতে বলেছেন হাইকোর্ট। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনগণের ভোটে নির্বাচিত, তাই তাদের বাদ দিয়ে ইউএনও সভাপতি হতে পারেন না বলেও উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে দাবি করা হয়। আমরা মনে করি, ইউএনও বনাম উপজেলা চেয়ারম্যানদের এই দ্বন্দ্ব নিরসন হওয়া প্রয়োজন। উপজেলা চেয়ারম্যানরা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে উপজেলা পরিষদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। জনগণের সব দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে তারা জড়িত। এ অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা যাবে না। উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও প্রতিটি কাজে একে অপরের সহযোগিতা করবে। তাহলে আর দ্বন্দ্ব নয়। অবসান হোক এ দ্বন্দ্বের। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
