গণতন্ত্র রক্ষায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বর্জন করা জরুরি
জসিম মজুমদার
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ৫৫ বছর হতে চলেছে। দীর্ঘ এই পথচলায় আমরা বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক, আমরা কি আমাদের মানসিকতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পেরেছি? আমরা সংবিধান পরিবর্তন, রাষ্ট্র সংস্কার ও সমাজ রূপান্তরের কথা বলি; কিন্তু নিজেদেও নৈতিকতা, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবর্তনে কতটা এগিয়েছি?
বাংলাদেশে নির্বাচন গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের পরই কোনো না কোনো মাত্রায় সহিংসতা, বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারামারি এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের পর থেকে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা একটি পুনরাবৃত্ত বাস্তবতা। ১৯৯১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম ছিল বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে সহিংসতার মাত্রা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী; ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ৫৩০টির মতো সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া যায় এবং শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৪১৪টি সহিংস ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয় এবং অন্তত ২২ জন নিহত হন। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ৫৩৪টি সহিংসতার ঘটনা এবং কয়েকজন নিহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন সংগঠন ১০০-এর বেশি নির্বাচন-পরবর্তী সহিংস ঘটনার খবর দিয়েছে; নির্বাচনি সময়জুড়ে ২৭৪টিরও বেশি সহিংস ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া ২০০০ থেকে ২০২৫ সময়কালে রাজনৈতিক সংঘাতে প্রায় চার হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা নয়; এগুলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতার প্রতিফলন।
গণতন্ত্র শুধু ভোট প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সহনশীলতা, মতভেদেও প্রতি শ্রদ্ধা ও আইনের শাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত। নির্বাচনের ফলাফল পক্ষে বা বিপক্ষে যাই হোক, সহিংস প্রতিক্রিয়া গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ক্ষুন্ন করে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজে বিভাজন ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি করে। সম্প্রতি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তও আমাদের সামনে এসেছে। এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, লক্ষ¥ীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, নির্বাচনের দিন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান। এমনকি চাঁদাবাজির অভিযোগে নিজ দলের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে, সদিচ্ছা থাকলে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
তবে দুই-চারজন ব্যক্তির পরিবর্তনে রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ও সমাজকে সত্যিকার অর্থে বদলাতে হলে রাজনৈতিক দল, নেতাকর্মী এবং নাগরিক সবার মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, দলের ভিন্নতা থাকতে পারে, আদর্শের প্রার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্র আমাদের সবার। রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি নয়।
তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, হত্যা ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বর্জন করা। আগে নিজেদেও নৈতিকতা ও মানবিকতা গড়ে তুলতে হবে।
আমরা যখন ব্যক্তি হিসেবে বদলাব, তখনই রাষ্ট্র ও সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তনের পথে এগোবে। আগামীর বাংলাদেশ হোক সংঘাতমুক্ত, হিংসামুক্ত ও সহিংসতামুক্ত একটি পরিপক্ব, সহনশীল ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
