বেকারত্ব নিরসন ও কর্মসংস্থান : সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আসল চ্যালেঞ্জ

ওসমান গনি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো এর বিপুল জনসমষ্টি। একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে থাকা মানুষগুলো তখনই সম্পদে পরিণত হয়, যখন তাদের মেধা ও শ্রমকে উৎপাদনশীল খাতে সফলভাবে বিনিয়োগ করা যায়। কিন্তু এই জনসমষ্টির একটি বিরাট অংশকে যদি কর্মসংস্থানের বাইরে রাখা হয়, তবে জাতীয় উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন শুধু একটি তাত্ত্বিক স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৪ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের শ্রমশক্তি জরিপের চিত্রটি আমাদের সামনে একাধারে আশার আলো এবং গভীর উদ্বেগের বার্তা নিয়ে এসেছে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার হলেও বেকারত্বের অভিশাপ বইছেন ২৬ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। আপাতদৃষ্টিতে এই সংখ্যাটি খুব বড় মনে না হলেও, এর পেছনের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা এবং শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা সরাসরি নির্ভর করে সেই দেশের শ্রমশক্তির যথাযথ ব্যবহারের ওপর। বিবিএসের তথ্যমতে, দেশের মোট শ্রমশক্তি এখন ৭ কোটি ৬ লাখ। এর মধ্যে পুরুষের অংশগ্রহণ ৪ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার এবং নারীর অংশগ্রহণ ২ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার। যদিও পূর্ববর্তী প্রান্তিকের তুলনায় বেকারের সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তবুও এই সংখ্যাটি একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত এই জরিপে বেকারের সংজ্ঞা যখন অত্যন্ত সংকীর্ণ অর্থাৎ সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করলে তাকে আর বেকার বলা হচ্ছে না, তখন প্রকৃত কর্মহীনতার চিত্রটি আরও জটিল বলে প্রতীয়মান হয়। যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করে উপযুক্ত কাজের অভাবে টিউশনি বা ছোটখাটো অনিয়মিত কাজে যুক্ত আছেন, তারা পরিসংখ্যানের খাতায় ‘কর্মজীবী’ হিসেবে ঠাঁই পেলেও কার্যত তারা ছদ্মণ্ডবেকারত্বের শিকার। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণের সুপ্ত প্রতিভাকে কাজে লাগাতে না পারা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় অপচয়।

জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে হলে আমাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক তথা নারীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান জরিপে দেখা যাচ্ছে, কর্মজীবী নারীদের সংখ্যা ২ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার। এই সংখ্যাটি গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও তা মোট নারী জনসংখ্যার তুলনায় এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। শ্রমশক্তির বাইরে থাকা ৫ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার মানুষের একটি বিরাট অংশ গৃহিণী, যারা দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও জাতীয় আয়ে তাদের এই শ্রমের কোনো আর্থিক স্বীকৃতি নেই। বিবিএস প্রথমবারের মতো উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত; কিন্তু বাজারজাতকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদের কর্মজীবী হিসেবে গণ্য না করার যে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছে, তা পরিসংখ্যানগতভাবে বাস্তবসম্মত হতে পারে। তবে এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে যদি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, অনলাইন ব্যবসা বা আইটি খাতের মতো উৎপাদনশীল কোনো না কোনো ধারায় প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে যুক্ত করা যেত, তবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বর্তমানের তুলনায় বহুগুণ দ্রুততর হতো।

বাংলাদেশের বেকারত্বের একটি প্রধান ও নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য হলো ‘শিক্ষিত বেকারত্ব’। প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে; কিন্তু দেশের শ্রমবাজার তাদের চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। এখানে শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মবাজারের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে একটি বিশাল দূরত্ব বা ‘স্কিল গ্যাপ’ বিদ্যমান। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকটা তাত্ত্বিক ও সনদনির্ভর, যেখানে হাতে-কলমে শিক্ষা বা আধুনিক কারিগরি দক্ষতার অভাব প্রকট। ফলে শিল্পমালিকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে, তারা প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন যোগ্য লোক খুঁজে পাচ্ছেন না, অন্যদিকে হাজার হাজার ডিগ্রিধারী চাকরির জন্য হাহাকার করছেন। এই বৈপরীত্য দূর করতে না পারলে ২৬ লাখের এই বেকার তালিকা ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘতর হবে এবং তরুণ সমাজের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক ও মানসিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হতে পারে।

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যানুযায়ী, শ্রমশক্তির বাইরে থাকা ৫ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মধ্যে শিক্ষার্থীরাও অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি ইতিবাচক দিক, কারণ তারা আগামী দিনের মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো- সেই অসুস্থ, প্রবীণ বা কাজ করতে অক্ষম ব্যক্তিদের নিয়ে, যাদের জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি যারা কাজ করতে সক্ষম; কিন্তু ‘অনিচ্ছুক’ বলে চিহ্নিত হয়েছেন, তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা উৎপাদনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। একটি আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত হলো- প্রতিটি সক্ষম নাগরিকের হাতে কাজের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া। এখানে কর্মসংস্থান বলতে শুধু সরকারি বা কর্পোরেট চাকুরিকে বোঝালে চলবে না; বরং আত্মকর্মসংস্থান, স্টার্টআপ সংস্কৃতি এবং কৃষি ও শিল্প খাতের আধুনিকায়নের মাধ্যমে কর্মের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে কর্মসংস্থানের পরিধি গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমান বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও অটোমেশন শ্রমবাজারের প্রথাগত ধরনকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের বিশাল শ্রমশক্তিকে যদি সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল লিটারেসি ও কারিগরি দক্ষতা প্রদান করা না যায়, তবে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অনেক পেছনে পড়ে থাকব। বিবিএসের এই ১৯তম আন্তর্জাতিক সম্মেলন (আইসিএলএস) অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা যদি কর্মসংস্থানবান্ধব না হয়, তবে সমাজের ভেতর অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হবে।

বেকারত্ব নিরসনে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে অন্য শিল্পগুলোর বিকাশ এখনও ধীরগতির। অথচ চামড়া শিল্প, প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ পড়ে আছে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি সেক্টরে যদি পর্যাপ্ত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা যায়, তবে শহর ও গ্রামের কয়েক লাখ শিক্ষিত তরুণ নিজেদের স্বাবলম্বী করতে সক্ষম হবে। বিবিএসের জরিপে যারা আগের ৩০ দিনে মজুরি বা মুনাফার বিনিময়ে কাজ খুঁজেছেন তাদের বেকার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, এই শ্রেণিকে কাজে ফেরানোর জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান কর্মসূচি (Employment Generation Program) গ্রহণ করা যেতে পারে।

জাতীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত ‘কারও হাত থাকবে না খালি’। বেকারত্বের সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রকে শুধু স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশ ঘটিয়ে গ্রাম পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা প্রদান এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। গ্রাম ও শহরের শ্রমবাজারের বিদ্যমান ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে যাতে জীবিকার তাগিদে মানুষকে শুধু রাজধানীমুখী হতে না হয়। নারীশক্তির পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ, যাতায়াত সুবিধা ও ডে-কেয়ার সেন্টারের মতো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতির চাকা আরও বেগবান হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৫ সালের এই সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ আছে, তেমনি আছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। শ্রমশক্তি জরিপের এই পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যার শুষ্ক সমষ্টি নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ২৬ লাখ ৬০ হাজার বেকার মানুষের মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং শ্রমশক্তির বাইরের ৫ কোটিরও বেশি মানুষকে উৎপাদনশীলতার কোনো না কোনো স্তরে নিয়ে আসা আজ আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া উচিত। যদি আমরা আমাদের এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশকে সঠিক শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারি, তবেই বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট দেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তার চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে এই বিশাল শ্রমশক্তির সঠিক ব্যবহারের ওপর। কর্মসংস্থানই হোক আগামী দিনের সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।