দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পেশাগত স্বীকৃতি কোথায়

আল শাহারিয়া, শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ এবং দুর্যোগ, শব্দ দুটি আমাদের ভৌগোলিক পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পলিমাটি দিয়ে গড়া এই বদ্বীপটি একদিকে যেমন প্রকৃতির অশেষ দানে ধন্য, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রাষ্ট্র। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, খরা কিংবা পাহাড় ধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের অর্থনীতির চাকা থমকে দিতে চায়। আশার কথা হলো, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা প্রচার এবং দুর্যোগ পরবর্তী উদ্ধার কাজে আমাদের সাফল্য ঈর্ষণীয়। কিন্তু এই অভাবনীয় সাফল্যের আড়ালে একটি বড় শূন্যতা দিনের পর দিন প্রকট হয়ে উঠছে। দুর্যোগব্যবস্থাপনার মতো একটি অতি-গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত খাতের পেশাগত স্বীকৃতি। দেশে দুর্যোগব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও পৃথক মন্ত্রণালয় থাকলেও এই খাতের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য নেই কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র বা বিশেষ ক্যাডার সুবিধা।

বিগত দুই দশকে বাংলাদেশ দুর্যোগব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নজর দিয়েছে। এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা Disaster Management বিভাগ চালু করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর শত শত দক্ষ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন।

তারা দুর্যোগের ঝুঁকি নিরূপণ, প্রশমন, প্রস্তুতি এবং টেকসই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে পারদর্শী। অথচ চার-পাঁচ বছর এই বিষয়ে বিশেষায়িত পড়াশোনা শেষ করে এই মেধাবী তরুণরা যখন শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে যান, তখন তারা এক গোলকধাঁধায় পড়েন। সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত পর্যায়ে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রফেশনাল পদ আজ অবধি সৃজন করা হয়নি।

বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনে একটি বিশাল অধিদপ্তর রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, এই বিশেষায়িত দপ্তরে দুর্যোগব্যবস্থাপনা বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য কোনো বিশেষ নিয়োগ বিধিমালা নেই। বর্তমানে এই দপ্তরের নীতিনির্ধারণী থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সাধারণ ক্যাডার বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাথে সরাসরি সম্পর্কহীন ব্যাকগ্রাউন্ডের কর্মকর্তাদের দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। একজন কৃষিবিদের জন্য যেমন আলাদা কৃষি ক্যাডার আছে, চিকিৎসকদের জন্য স্বাস্থ্য ক্যাডার কিংবা প্রকৌশলীদের জন্য এলজিইডি বা পিডব্লিউডির মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গ্র্যাজুয়েটদের জন্য তেমন কোনো প্ল্যাটফর্ম এখনও তৈরি হয়নি। ফলে রাষ্ট্র একদিকে যেমন হাজার হাজার দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে, অন্যদিকে তাদের যথাযথ স্থানে নিয়োগ না দিয়ে এক ধরনের মেধার অপচয় করছে।

পেশাগত স্বীকৃতির এই অভাব শুধু শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় দুর্যোগব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা যখন কোনো দুর্যোগ সামলাতে যাই, তখন শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা যথেষ্ট নয়। সেখানে প্রয়োজন দুর্যোগের ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ুগত প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা এবং বৈজ্ঞানিক মডেলের ভিত্তিতে আগাম বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দেওয়া। সাধারণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পক্ষে দুর্যোগের এই টেকনিক্যাল ও বৈজ্ঞানিক দিকগুলো বোঝা সময়সাপেক্ষ। অথচ দুর্যোগের মুহূর্তে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান। বিশেষজ্ঞ জনবল না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ত্রাণ বিতরণ বা পুনর্বাসনের মতো কাজগুলো এখনও সনাতনী পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে, যা আধুনিক বিশ্বের দুর্যোগ মোকাবিলা দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাপান, ফিলিপাইন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে দুর্যোগব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের জন্য আলাদা বিশেষায়িত প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। তারা বোঝেন যে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুনিপুণ বিজ্ঞানের ফসল। বাংলাদেশেও এক সময় স্বাস্থ্য কিংবা কৃষি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে যেভাবে ক্যাডার সার্ভিসের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ জনবল নিয়োগ করা হয়েছিল, দুর্যোগব্যবস্থাপনায় সেই একই মডেল প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। আমরা শত শত কোটি টাকা খরচ করে সাইক্লোন সেন্টার বা বেড়িবাঁধ তৈরি করছি, যা অবকাঠামোগত উন্নয়ন। কিন্তু সেই অবকাঠামোকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য যে দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন, সেই বিনিয়োগের জায়গাটি বারবার উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

দুর্যোগকে আমরা এখনও শুধু ত্রাণ বিতরণের মতো একটি মানবিক কাজ হিসেবে দেখি। অথচ আধুনিক বিশ্বে দুর্যোগব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুর্যোগব্যবস্থাপনার একজন গ্র্যাজুয়েট জানেন কীভাবে দুর্যোগের ঝুঁকিকে উন্নয়নের সুযোগে রূপান্তর করা যায়। তারা জানেন কীভাবে স্থানীয় জনপদকে সম্পৃক্ত করে একটি সহনশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। যখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ থাকবে না, তখন বড় বড় প্রকল্পগুলোও মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

দুর্যোগব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থাকা সত্ত্বেও এই খাতের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বিশেষ ক্যাডার সুবিধা না থাকাটা আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এক বড় বৈপরীত্য। বিসিএস পরীক্ষায় কারিগরি ক্যাডার হিসেবে এই বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা এখন অপরিহার্য। যদি কৃষি ক্যাডার থাকতে পারে, তবে দুর্যোগপ্রবণ এই দেশে কেন দুর্যোগব্যবস্থাপনা ক্যাডার থাকবে না? মাঠপর্যায়ে বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (PIO) বা জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা (DRRO) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ের ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বর্তমানে এই পদগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে এমন সব বিষয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের দুর্যোগ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো জ্ঞান নেই। এর ফলে মাঠপর্যায়ে কাজের সমন্বয় এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ ব্যাহত হয়।

উচ্চশিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়া একটি জাতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। হাজার হাজার শিক্ষার্থী যখন দুর্যোগব্যবস্থাপনার মতো একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়ে পড়াশোনা করে বুঝতে পারে, যে তাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র নেই, তখন তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়। এই হতাশা শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবন নয়, বরং এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ভবিষ্যৎ শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করছে। আমরা কি তবে শুধু সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বিভাগগুলো খুলেছি? যদি এই মেধাকে রাষ্ট্র কাজে লাগাতে না পারে, তবে এই উচ্চশিক্ষার সার্থকতা কোথায়?

জাতীয় দুর্যোগব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫-এর ৯৯ এবং ২০০ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পেশাদারিত্ব আনয়নের কথা বলা হয়েছে। এমনকি দুর্যোগব্যবস্থাপনা আইন ২০১২-এর মূল লক্ষ্যই হলো এই খাতকে সমন্বিত ও শক্তিশালী করা। অথচ বাস্তবতা হলো, যেখানে খোদ নীতিমালায় প্রতিটি আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীতে পৃথক দুর্যোগব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠনের নির্দেশনা রয়েছে, সেখানে এই খাতের দক্ষ গ্র্যাজুয়েটদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়োগ বিধিমালা আজও অন্ধকারেই রয়ে গেছে।

একটি দুর্যোগ-সহনশীল স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। দুর্যোগের ভয়াবহতা কমাতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন প্রক্রিয়া সফল করতে হলে পেশাদার দুর্যোগব্যবস্থাপকদের নেতৃত্ব প্রয়োজন। সরকার যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে ভবিষ্যতে বড় কোনো বিপর্যয়ে আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। সময় এসেছে দুর্যোগব্যবস্থাপকদের পেশাগত মর্যাদা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার।

পরিশেষে বলতে চাই, দুর্যোগের দেশে দুর্যোগব্যবস্থাপকদের স্বীকৃতি না দেওয়াটা অনেকটা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছাড়া হাসপাতাল চালানোর চেষ্টার মতো। মন্ত্রণালয়ের নাম এবং অবকাঠামোর চাকচিক্য যেমন আছে, তেমনি সেই কাঠামোতে প্রাণসঞ্চার করতে বিশেষজ্ঞ জনবল নিয়োগের পথও প্রশস্ত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দুর্যোগব্যবস্থাপনা গ্র্যাজুয়েটদের অন্তর্ভুক্তিই পারে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি দুর্যোগ-প্রতিরোধী রাষ্ট্র হিসেবে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে। তাদের মেধা ও শ্রমকে অবহেলা নয়, বরং সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করাই হোক আধুনিক বাংলাদেশের লক্ষ্য।