শক্তিশালী বিরোধীদলই সরকারের আত্মশুদ্ধির পথ

আবু বকর, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ ঘনীভূত অন্ধকারকে ঠেলে পূব আকাশে সূর্য পূর্ণরূপে উদিত হয়েছে। এবার সূর্য তার আলো ছড়িয়ে চারপাশকে আলোকিত করার পালা। যে অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছিল- চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি, গুম, হামলা, হত্যা,? নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি নানা অসঙ্গতিতে। গণতন্ত্রের নামে তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার লাগাম টানাই ছিল পতিত সরকারের মূলনীতি। সেই অন্ধকারকে দূর করে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে।

পরে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হ?য়। সে সময়ে কোনো সংসদ অধিবেশন ছিল না। আবার এ ধরনের সরকার গঠন সংবিধান অনুযায়ী না হলেও সংকটকালীন পরিস্থিতিতে জনগণের মতের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছিল। আর এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলের সরকারের সমালোচনা সংবাদ সম্মেলন, সমাবেশ ইত্যাদি মাধ্যমে করা হলেও কোনো সংসদীয় উপায়ে করার সুযোগ ছিল না?। ফলে নানা বিতর্কমূলক কর্মকাণ্ড ঘটলেও সাবেক সরকার এড়িয়ে গিয়েছিল। এতে দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে?? গিয়েছিল। এমনকি মবতন্ত্র রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। দেশের সংকটকালে এ ধরনের সরকার গঠন হলেও এখানে বিরোধীদলীয় শক্তিশালী অবস্থান খুব থাকে না। ফলে নানা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলো- রাষ্ট্রপতিকে প্রাসাদবন্দি করে রাখা। সম্প্রতি দেশের এক জাতীয় দৈনিকে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে এমন লোমহর্ষক ঘটনা বেরিয়ে আসে। যেখানে রাষ্ট্রপতি নিজে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তার করুণ পরিণতি তুলে ধরেন। যেখানে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হ?লেও পরবর্তীতে তাকে চরম অপদস্থ করা হয়েছিল। যেমন- সংবিধান মোতাবেক রাষ্ট্রপতিকে কোনো চুক্তি, কোনো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন সম্পর্কে অবগত করা, বিদেশ সফর আগে ও পরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ করার বিষয় থাকলেও তা মানা হয়নি।

এছাড়াও বিভিন্ন রাষ্ট্রের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রপতির বিদেশ সফর, বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগদান, প্রেস উইং বাতিল, দূতাবাস ও হাইকমিশনে তার ছবি নামানো, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে তার ছবি সংবলিত ক্রোড়পত্র প্রকাশ বন্ধ? ইত্যাদি উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির মর্যাদা ও সাবেক সরকারের নিরপেক্ষ অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্র প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন প্রাসাদ বন্দি নজিরবিহীন। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রপতিকে পুতুল করে রাখায় জনগণের টেক্সের টাকায় এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে নানা ব্যয় অপচয় ছাড়া কিছুই ছিল না। তখন রাজনৈতিক দলগুলোর এ নিয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল না। মূলত এ ধরনের সরকারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী ভূমিকা না থাকায় এমন অনাচার সৃষ্টি হয়েছিল। নির্বাচিত সরকারের সময়ে শক্তিশালী বিরোধীদল থাকলে এমন ঘটনা ঘটত না।

যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রস্তাবের ভিত্তিতে নানা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। অবশেষে দেশ পরিচালনা সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতার লাগাম টানতে তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য নীতিমালা। যেখানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন হবে। এছাড়াও দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, বিরোধীদল হইতে ডেপুটি স্পিকার, মৌলিক অধিকার, বিচার?? বিভাগের স্বাধীনতা, এক?ই ব্যক্তির ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা, রাষ্ট্রপতি? ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ইত্যাদি রয়েছে। অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়। দলটি একক সরকার গঠন করেছে। এক্ষেত্রে প্রধান বিরোধীদলের অবস্থান হতে হবে শক্ত ও গঠনমূলক। কারণ, বিরোধীদলগুলো হলো সরকারের আয়না স্বরূপ। ক্ষমতাসীন দল যাতে জনগণের প্রভু মনে না করে তা থেকে বিরত রাখতে নানা গঠনমূলক সমালোচনা, সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি অসংগতি তুলে ধরে সংসদের বিরোধীদল। তবে গণতন্ত্র চর্চিত রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলের মধ্যে ভারসাম্য অবস্থান কম?ই দেখা যায়।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সংজ্ঞা হলো- ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য।’ অর্থাৎ, সরকার জনগণের সম্মতি ও সমর্থনে গঠিত হবে, জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে আর সরকার জনগণের স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয় না নির্বাচিত সরকারের দ্বারা। বিশেষ করে যখন শক্তিশালী বিরোধীদল থাকে না, তখন ক্ষমতাসীন দল দ্বারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে এ ধরনের চিত্র দেখা গিয়েছিল। নামমাত্র পুতুল বিরোধীদল বসিয়ে ক্ষমতাসীন দল কর্তৃত্ববাদী প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে সরকার হয়েছিল জনগণের প্রভু। এতে সরকারের দ্বারা দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এভাবেই যখন তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে একচেটিয়া আধিপত্য চলছিল, তখনই জন অসন্তোষের ফলে ১৫ বছরের রাজত্ব ঘুণে ধরা বেড়ার মতো ভেঙে পড়ল। এর অন্যতম কারণ হলো সরকারকে জনমুখী ও দেশের স্বার্থে কাজ করানোর জন্য বিরোধীদলের শক্ত উপস্থিতির অভাব।

মার্কিন রম্য লেখক, সাহিত্যিক ও প্রভাষক মার্ক টোয়েইন বলেন, ‘দেশের প্রতি সব সময় অনুগত থাকো। কিন্তু সরকারের প্রতি তখনই অনুগত থাকবে, যখন তা সেটার যোগ্য হবে।’ তার এই উক্তিতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করা হলেও যদি বিরোধীদল ও জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়, তাহলে জন? অসন্তোষ তৈরি হবে। আবার বাংলাদেশের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এএসএম শাহজাহান বলেন, ‘গণতন্ত্র মানে কিছু লোককে ক্ষমতায়িত করা নয়, বরং সব জনগণকে ক্ষমতায়িত করা।’ এ থেকে বুঝা যায় যে, বিরোধীদল যখন ক্ষমতাসীন দলের পুতুলে পরিণত হয়, তখন জনগণকে ক্ষমতায়িত করা হয় না। বিপরীতে সরকারকে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়।

যুগে যুগে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যত সরকার পতন হয়েছে, সেখানে শক্তিশালী বিরোধীদলের উপস্থিতি অন্যতম প্রধান কারণ। তবে গণ?অভ্যুত্থান পরবর্তী এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনীতির নতুন মেরুকরণ দেখা দিয়েছে। বিএনপি দ?ই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠনের আগেই বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। স্বাধীনতার পর এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন। ফলে জনগণের মধ্যে আশার আলো দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকার ও বিরোধীদল নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। আমাদের পথ ও মত ভিন্ন থাকতে পারে; কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।’ এই বার্তা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, দলমত নির্বিশেষে আমাদের ভিন্ন আদর্শ থাকলেও দেশের স্বার্থে আমরা বটবৃক্ষের মতো।

বহুল আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারের নানা বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনার জন্য বিরোধীদলের অবস্থান তৈরি হয়েছে। তবে এ অবস্থানকে শক্তিশালী করতে অবশ্যই সরকারের আদর্শ গণতন্ত্র নীতিমুখী হতে হবে।