রক্ষক যখন ভক্ষক : পুলিশি নির্যাতন ও মানবাধিকারের সংকট
আমানুর রহমান, লেখক, কবি ও কলামিস্ট
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমাজ ও রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান ও পবিত্র দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ হবে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা।
কিন্তু বাস্তব চিত্রটি যখন এর সম্পূর্ণ বিপরীত হয়, তখন তা শুধু হতাশাজনকই নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত। প্রতিনিয়তই আমাদের চারপাশে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যেখানে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে পুলিশ সাধারণ মানুষের গায়ে অনৈতিক ও বেআইনিভাবে হাত তুলছে। এই ধরনের পুলিশি নির্যাতন শুধু মানবাধিকারেরই চরম লঙ্ঘন নয়, বরং এটি আইনের শাসনের পরিপন্থি একটি গুরুতর অপরাধ।
?আমাদের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো নাগরিককে বিনা বিচারে শাস্তি দেওয়ার অধিকার পুলিশের নেই। পুলিশের কাজ হলো অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা বা সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার করে আদালতের কাছে সোপান করা। আইন অনুযায়ী তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিতে পারে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গায়ে হাত তোলা, বেধড়ক পেটানো বা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার কোনো আইনি এখতিয়ার তাদের দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না। এছাড়া, ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেকোনো সদস্যের দ্বারা সংঘটিত শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন একটি সুস্পষ্ট ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তা সত্ত্বেও, রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষকে চড়-থাপ্পড় মারা, অকারণে লাঠিচার্জ করা বা হেফাজতে নিয়ে মারধরের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, দেশে আইনের প্রয়োগের চেয়ে ক্ষমতার অপপ্রয়োগই বেশি হচ্ছে।?
এই বেআইনি মারধর ও নির্যাতনের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে আমাদের সমাজব্যবস্থা ও মনস্তত্ত্বে। জনসমক্ষে বা আড়ালে একজন সাধারণ মানুষকে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মারধর করে, তখন সেই ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। এর ফলে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের যে বিশ্বাস ও সম্মান থাকার কথা, তা তীব্র ভীতি ও ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়। মানুষ যখন দেখে যে, বিপদে যাদের কাছে তারা আশ্রয় চাইবে, তারাই বিনা কারণে বা সামান্য সন্দেহের বশে গায়ে হাত তুলছে, তখন সমাজের প্রতিটি স্তরে এক ধরনের গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। একটি সভ্য সমাজে আইনভঙ্গকারীকে আইনের আওতায় এনে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়; রাস্তায় ফেলে পেটানো কোনো সভ্যতার লক্ষণ হতে পারে না। যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিজেরাই আইন ভঙ্গ করে, তখন সমাজে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পুলিশের এই ধরনের অনৈতিক আচরণের পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জবাবদিহিতার চরম অভাব এবং ক্ষমতার দম্ভ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সাধারণ মানুষকে মারধরের পর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বড়জোর তাদের সাময়িক বরখাস্ত বা বদলি করা হয়, যা আসলে কোনো কঠোর শাস্তি নয়। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অন্যান্য সদস্যদেরও ক্ষমতার অপব্যবহারে বেপরোয়া করে তোলে। পাশাপাশি, পুলিশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় মানবাধিকার, সংবেদনশীলতা ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর ঘাটতি রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ অনেক সময় পুলিশকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করে।
?এই অচলায়তন ভাঙতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন জবাবদিহিতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
পুলিশের কোনো সদস্য যদি বেআইনিভাবে কারো গায়ে হাত তোলে, তবে তাকে শুধুমাত্র বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনলেই হবে না, বরং প্রচলিত ফৌজদারি আইনে তার বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি তাদের মানবাধিকার বিষয়ে সংবেদনশীল করার জন্য নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পুলিশ জনগণের সেবক, প্রভু নয়। নাগরিকদের টাকায় পরিচালিত একটি বাহিনী কোনোভাবেই নাগরিকদের ওপর অন্যায় বলপ্রয়োগ করতে পারে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইন প্রয়োগকারীদের সর্বপ্রথম আইন মেনে চলতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এমন একটি পুলিশ বাহিনী কাম্য, যারা হবে মানবিক, পেশাদার এবং জনগণের নির্ভরতার প্রতীক।
