নতুন সরকারের কাছে পোশাকশিল্পের প্রত্যাশা
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পোশাকশিল্প শুধু একটি খাত নয়, এটি আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। অন্তর্বর্তীকালীন বা নতুন সরকারের আগমনে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিক এবং উদ্যোক্তাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের প্রধান ধারক হলো- তৈরি পোশাকশিল্প (RMG)। আমাদের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকটে এই শিল্প এক কঠিন সময় পার করছে। এই সন্ধিক্ষণে নতুন সরকারের কাছে পোশাকশিল্পের প্রত্যাশা শুধু কিছু আর্থিক সুবিধা নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা। পোশাকশিল্পের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। গত কয়েক মাসে শিল্পাঞ্চলগুলোতে যে অস্থিরতা দেখা গেছে, তাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারের কাছে বড় প্রত্যাশা হলো, শ্রমঘন এই অঞ্চলে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো উসকানি বা গুজবে যাতে কারখানা বন্ধ না হয় এবং কারখানার সম্পদ যাতে সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা কাম্য।
গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট বর্তমানে পোশাকশিল্পের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং জেনারেটর চালাতে গিয়ে খরচ বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে। প্রয়োজনে আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে নীতিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে।
পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বন্দর ও কাস্টমস সংক্রান্ত জটিলতা আমাদের চিরচেনা সমস্যা। চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট রপ্তানি প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, তারা বন্দরে অটোমেশন নিশ্চিত করবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করবে। এছাড়া, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পোশাকশিল্পের বিকাশে নীতিগত ধারাবাহিকতা অত্যন্ত জরুরি। হুটহাট কর বৃদ্ধি বা আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করে। নতুন সরকারের উচিত হবে একটি দীর্ঘমেয়াদী শুল্ক ও কর কাঠামো প্রণয়ন করা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের (SME) কারখানাগুলো যেন টিকে থাকতে পারে, সেজন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এছাড়া, রপ্তানি আয়ের ডলার রেট এবং আমদানির এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে। শ্রমিকরাই এই শিল্পের প্রাণ। তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন না হলে শিল্পের টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব। সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, মালিক ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া। রেশন ব্যবস্থা চালু করা, মানসম্মত আবাসন এবং ন্যূনতম মজুরির নিয়মিত সমন্বয় নিয়ে সরকারকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে, ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক অধিকারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান (ILO Convention) বজায় রাখার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে হবে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করবে। এর ফলে অনেক শুল্কমুক্ত সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সরকারকে এখন থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে ‘জিএসপি প্লাস’ (GSP+) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে কার্যকর কূটনীতি চালাতে হবে। আমাদের বাজার ধরে রাখতে হলে কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই।
কেবল টি-শার্ট বা ট্রাউজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের হাই-ভ্যালু বা উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে। কৃত্রিম তন্তু (Man-made Fiber) এবং টেকনিক্যাল টেক্সটাইল উৎপাদনে সরকারকে বিশেষ কর ছাড় দিতে হবে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা গবেষণাগার স্থাপন এবং নতুন প্রযুক্তির প্রসারে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে।
পোশাকশিল্প শুধু কাপড় সেলাইয়ের কারখানা নয়, এটি বাংলাদেশের কোটি মানুষের স্বপ্ন ও স্বনির্ভরতার প্রতীক। নতুন সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও, সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে এই শিল্পকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমরা আশা করি, সরকার পোশাকশিল্পের এই যৌক্তিক প্রত্যাশাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ পেলে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
