রাষ্ট্র কি শুধু দেবে, নাকি নাগরিকেরও দায় আছে?

শামসুর রহমান

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্রের যেকোনো স্তরের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যখন নিজেকে ‘সর্বজনীন’ ঘোষণা করেন, তখন সেটি গণতান্ত্রিক চেতনার ইতিবাচক বহিঃপ্রকাশ। তিনি দল-মত-ধর্ম-পেশা নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি- এটি একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি। ফলে জনগণের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবে বাড়ে। তারা উন্নয়ন চায়, নিরাপত্তা চায়, ন্যায়বিচার চায়, মৌলিক অধিকার চায়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রত্যাশা আরও তীব্র হয়, কারণ প্রতিশ্রুতির ভাষা থাকে আশাবাদী, ভবিষ্যতের প্রত্যাশা থাকে উজ্জ্বল। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত হয় অন্য জায়গায়।

সমাজের একটি অংশ জনপ্রতিনিধি বা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার বদলে ‘তর্কের জন্য তর্ক’-এর সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা বিতর্ক সৃষ্টি করে আলোচনার জন্য নয়, বরং বিভাজনের জন্য। ভালো কাজের স্বীকৃতি না দিয়ে নিন্দাকে প্রধান হাতিয়ার বানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজনৈতিক পরিসর- সবখানেই যেন অভিযোগ, কুৎসা ও নেতিবাচকতার প্রতিযোগিতার মহড়া চলে। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাও বাধাগ্রস্ত হয়; তা কিন্তু ভেবে দেখা হয় না। আরও উদ্বেগজনক হলো আমরা প্রায়ই রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব নিয়ে বড় বড় কথা বলে থাকলেও একজন নাগরিক হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কতটুকু দায় রয়েছে, সেই দায়িত্ব নিয়ে নীরব থাকি। বিশেষ করে, সময়মতো কর দেওয়া, রাষ্ট্রের আইন মানা, ভিন্নমতকে সহ্য করা-গুরুত্ব দেওয়া, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঘুষসহ অনিয়ম-দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা বা বন্ধ করা- এসব কি শুধু সরকারের কাজ? নাগরিক যদি ন্যায়-নীতির মধ্যে থেকে নির্ভয়ে নিজ দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখায়, তবে রাষ্ট্রকাঠামো কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে? এই চিন্তাই ক’জনে করি বা করেন? এ প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক।

দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বাইরে থাকা বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নব গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছে বলে অনেকে বলছেন। আর এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত নতুন সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়েছে। ধরা যাক, এই সরকার দেশের ২০ কোটি মানুষকে শান্তি, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু শান্তি কি একতরফাভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব? যদি নাগরিক সমাজ বিভক্ত থাকে, যদি প্রতিটি ইস্যুতে স্বার্থান্বেষী ব্যাখ্যার নামে ‘অঘোষিত যুদ্ধ’ চলে, তবে সরকারের সদিচ্ছাও যে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সুফল যে দিতে পারবে না, এই বিষয়গুলো ক’জন নাগরিক বিবেচনায় রাখি?

এখানে দুটি সমান্তরাল প্রশ্ন- প্রথমত, সরকার কী করবে? দ্বিতীয়ত, নাগরিক কী করবে?

সরকারের দায়িত্ব হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা, বৈষম্য কমানো, উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। কিন্তু নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়- গুজব না ছড়ানো, দায়িত্বশীল মতপ্রকাশ, রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা, কর ও নাগরিক কর্তব্য পালন, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল থাকা এবং সামাজিক সেতুবন্ধ গড়ে তোলা। মনে রাখা উচিত- গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন নয়; এটি পারস্পরিক আস্থার চুক্তি। সরকার যদি জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে যুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং জনকল্যাণমুখী; কোনোভাবেই অর্থহীন বিরোধিতা নয়। একইভাবে নাগরিক যদি নিজেকে শুধু ‘প্রাপ্তির অধিকারী’ হিসেবে দেখেন, ‘দায়িত্বের অংশীদার’ হিসেবে না দেখেন, এ ক্ষেত্রেও গণতন্ত্র একপেশে হয়ে পড়ে। যে প্রতিফলন থেকে ‘আজব বাংলাদেশ’ কথাটি প্রায়ই শোনা যায়; কিন্তু পরিবর্তনের সূচনা কোথা থেকে হবে, কারা এর নিয়ামক? এমন আওয়াজ খুব কমই শোনা যায়। অথচ রাষ্ট্রের ‘শুদ্ধি’ ও সমাজের ‘পরিশুদ্ধি’ এই দুটি শব্দই সমান্তরাল প্রক্রিয়া। অর্থাৎ নাগরিক সচেতনতা, মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং নৈতিক নেতৃত্ব-এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শক্তিশালী না হলে বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফেরা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তাহলে প্রশ্ন আসে- বাংলাদেশ কি সঠিক পথে ফিরতে পারবে? এককথায় বললে সম্ভব- যদি সরকার প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকে এবং নাগরিক সমাজ দায়িত্ববোধে জাগ্রত হয়। যদি সমালোচনা হয় গঠনমূলক, যদি বিরোধিতা হয় নীতিগত, যদি প্রতিযোগিতা হয় উন্নয়নে- তবেই সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ‘অঘোষিত যুদ্ধ’ রূপ নেবে সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র একা সব করতে পারে না; নাগরিকও একা পারে না। দুই পক্ষের সম্মিলিত দায়বদ্ধতাই পারে একটি জাতিকে অস্থিরতা থেকে স্থিতিশীলতার পথে ফেরাতে। প্রশ্নটি তাই সরকারের চেয়ে বড়- আমরা কি নাগরিক হিসেবে প্রস্তুত?

শামসুর রহমান

সাংবাদিক